সরকারি হাসপাতালে বেশি যান বরিশালের মানুষ

এক বছরে গড়ে ৬২ শতাংশ মানুষ সরকারি ও বেসরকারি উভয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে যাচ্ছে ৬২ শতাংশ মানুষ ও ৬১ শতাংশ মানুষ যাচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতালে। মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩৯ শতাংশ মানুষ কখনোই বেসরকারি হাসপাতালে ও ৩৮ শতাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালে যাননি।

সরকারি হাসপাতালে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ বেশি চিকিৎসা নিচ্ছেন। গ্রামে এই হার ৬৩ শতাংশ ও শহরে ৫৯ শতাংশ। বয়স অনুপাতে সরকারি হাসপাতালে বেশি চিকিৎকসা নেন ১৮-২৯ বছর বয়সী মানুষ, ৬৩ শতাংশ। এরপর পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সী ৬২ শতাংশ ও ৩০-৪৯ বছর বয়সী ৬২ শতাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালে গেছেন। অন্যদিকে, বেসরকারি বা এনজিও পরিচালিত হাসপাতালে বেশি যাচ্ছেন শহরের মানুষ ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলে ৫৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কারবিষয়ক জনমত জরিপ-২০২৫-এ এই তথ্য উঠে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের অনুরোধে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত মাসে এই জরিপ করে। গত সপ্তাহে বিবিএসের পক্ষ থেকে জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদন সংস্কার কমিশনের সদস্যদের দেওয়া হয়। বিবিএস ৬৪ জেলার শহর ও গ্রামের ৮ হাজার ২৫৬টি পরিবারের ওপর জরিপ করেছে। জরিপে প্রতিটি পরিবার থেকে ১৮ বছর বা এর বেশি বয়সী একজন নারী বা পুরুষের মতামত নেওয়া হয়েছে।

জরিপ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য ও সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক হেলথ সাপোর্ট ট্রাস্টের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ডা. আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই জরিপে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালভিত্তিক সুনির্দিষ্ট আলাদা তথ্য নেই। একই মানুষ দুই কেন্দ্রেই চিকিৎসা নিয়েছেন ও দুই ক্ষেত্রেই তাদের মতামত যুক্ত করা হয়েছে। এটি মাল্টিপল রিপোর্ট। একজন রোগী সরকারি ও বেসরকারি দুই জায়গাতেই গেছে। উভয় ক্ষেত্রেই তাদের মতামত যুক্ত করা হয়েছে।

জরিপে উঠে আসা তথ্য-বিশ্লেষণ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে সেবার গুণ মানুষ বেশি পছন্দ করেছেন। কিন্তু সেখানে বেশি মূল্য দিতে হয়। রোগীরা সেবার গুণ বিচার করে সেখানকার সেবাদানকারীদের ব্যবহার, হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালে মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা পাচ্ছেন, কিন্তু সেবার মান অতটা ভালো না।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘আমাদের সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে হবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবাদানকারীদের আচার-ব্যবহার, রোগীদের প্রতি মনোযোগ এই তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। রোগী যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেটা দেখতে হবে। ভালো চিকিৎসক ও ডায়াগনোসিস ব্যবস্থা আছে। মানুষ সাশ্রয়ে সেবা পান। কিন্তু সেবার মান ঠিক করতে পারলে বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে সরকারি হাসপাতালে বেশি রোগী আসবে।’ 

বরিশালে সরকারি ও চট্টগ্রামে বেসরকারি হাসপাতালে বেশি : জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের আট বিভাগের মধ্যে সরকারি হাসপাতালে বেশি যান বরিশালের মানুষ ৬৯ শতাংশ ও কম যান ঢাকার মানুষ ৫৭ শতাংশ। এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগের ৬৮ শতাংশ, চট্টগ্রামের ৬৭, রাজশাহীর ৬৩ দশমিক ৫, খুলনার ৬২, রংপুরের ৫৯ ও সিলেটের ৫৮ শতাংশ মানুষ এসব হাসপাতালে যান।

অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বেশি নিচ্ছেন চট্টগ্রামের মানুষ, ৭৫ শতাংশ। এরপর বরিশাল ও ঢাকায় ৬৬ শতাংশ করে, সিলেটে ৬০ দশমিক ৫, ময়মনসিংহে ৬০, খুলনায় ৫৭, রংপুরে ৪৮ ও রাজশাহীতে ৪৭ শতাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালে যাচ্ছেন।

বেসরকারি ও এনজিও পরিচালিত হাসপাতালের মধ্যে মানুষ বেশি যাচ্ছেন বেসরকারি হাসপাতালে ৯৮ শতাংশ ও বাকি ৩ শতাংশ যাচ্ছেন এনজিও পরিচালিত হাসপাতালে।

উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বেশি যাচ্ছেন : দেশে সাত ধরনের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে। এর মধ্যে চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে বেশি যাচ্ছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৮ শতাংশ মানুষ। এরপর জেলা সদর হাসপাতালে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫, কমিউনিটি ক্লিনিকে ২০, বিশেষায়িত হাসপাতালে ১৪, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে ১১ ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন।

গ্রামাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি যাচ্ছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪২ শতাংশ। এরপর কমিউনিটি ক্লিনিকে ২৭ শতাংশ, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০, জেলা সদর হাসপাতালে ২৪, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে ১৪, বিশেষায়িত হাসপাতালে ১৩ ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন।

শহরাঞ্চলের মানুষ বেশি যাচ্ছেন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৭ শতাংশ। এরপর জেলা সদর হাসপাতালে ৩৫ শতাংশ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৮, বিশেষায়িত হাসপাতালে ১৮, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে ৪, কমিউনিটি ক্লিনিকে ৩ ও নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২ শতাংশ মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন।

খুলনায় জেলা সদর হাসপাতাল ও ময়মনসিংহে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বেশি রোগী : সরকারি সাত ধরনের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে বিশেষায়িত হাসপাতালে বেশি যাচ্ছেন ঢাকার মানুষ ১৭ শতাংশ। এরপর খুলনায় ১৬ শতাংশ, বরিশালে ১৪ দশমিক ৫, চট্টগ্রামে ১৪, ময়মনসিংহে ৯, রংপুরে ১২ ও রাজশাহীতে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ এই হাসপাতালে যাচ্ছেন।

সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেশি যাচ্ছেন ঢাকার মানুষ, ৩২ শতাংশ। এরপর চট্টগ্রামে ২৯ শতাংশ, বরিশালে ২৬, রাজশাহীতে ২৩ দশমিক ৫, ময়মনসিংহে ২৩, রংপুরে ১৮, সিলেটে ১৭ দশমিক ৫ ও খুলনায় ১৬ শতাংশ মানুষ এই হাসপাতালে যাচ্ছেন।

জেলা সদর হাসপাতালে বেশি যান খুলনার মানুষ, ৪২ শতাংশ। এরপর সিলেটে ৩২ শতাংশ, বরিশালে ৩১, ময়মনসিংহে ২৭, ঢাকা ও রংপুরে ২৬, রাজশাহীতে ২৪ দশমিক ৫ ও চট্টগ্রামে ২১ শতাংশ মানুষ এই হাসপাতালে যান।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বেশি যান ময়মনসিংহের মানুষ, ৫৩ শতাংশ। এরপর চট্টগ্রামে ৪৫ শতাংশ, বরিশালে ৪০, রংপুর ও সিলেটে ৩৬, রাজশাহীতে ৩৫, খুলনায় ৩২ ও ঢাকায় ৩১ শতাংশ মানুষ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যান।

ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে বেশি যাচ্ছেন রাজশাহীর মানুষ, ১৬ শতাংশ। এরপর রংপুরে ১৮ শতাংশ, বরিশালে ১৪ দশমিক ৫, চট্টগ্রামে ১৩ দশমিক ৫, সিলেটে ৯, ঢাকায় ৮, খুলনায় ৫ ও ময়মনসিংহে ৪ শতাংশ মানুষ এখানে চিকিৎসা নিতে যান।

কমিউনিটি ক্লিনিকে বেশি রোগী রংপুরে, ৩৭ শতাংশ। এরপর রাজশাহীতে ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ, সিলেটে ২১, ময়মনসিংহে ২০, বরিশালে ১৯, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ১৫ এবং ঢাকায় ১৩ শতাংশ মানুষ এখানে যাচ্ছেন।

এমবিবিএস চিকিৎসক পেয়েছেন ৮১% মানুষ : জরিপের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়া ৮১ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের সেবা পেয়েছেন। ৫ শতাংশ মানুষকে ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতাকর্মী এবং ৪ শতাংশ করে মানুষকে কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা দানকারী ও পল্লী চিকিৎসকের চিকিৎসা নিতে হয়েছে। এরপর ২ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারীর, ১ শতাংশ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক, শূন্য দশমিক ২ শতাংশ মানুষ আয়ুর্বেদিক ইউনিয়নের চিকিৎসক এবং ১ শতাংশ করে প্যারামেডিক্স বা পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টের চিকিৎসা পেয়েছেন।

গত বছর গ্রামাঞ্চলের ৭৭ শতাংশ মানুষ এমবিবিএস চিকিৎসকের সেবা পেয়েছেন। এরপর ৬ শতাংশ মানুষ পল্লী চিকিৎসকের ও ৫ শতাংশ মানুষ কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা দানকারীর চিকিৎসা পেয়েছেন।

অন্যদিকে শহরাঞ্চলে এমবিবিএস চিকিৎসক পেয়েছেন ৮৯ শতাংশ মানুষ। এরপর হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের সেবা পেয়েছেন ২ শতাংশ ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবা দানকারীর ১ শতাংশ মানুষ।

আট বিভাগের মধ্যে এমবিবিএস চিকিৎসক বেশি পেয়েছেন ঢাকার মানুষ, ৯২ শতাংশ ও কম পেয়েছেন রংপুরের মানুষ ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর ময়মনসিংহে ৮৪ শতাংশ, সিলেটে ৮০, রাজশাহী, বরিশাল ও খুলনায় ৭৯ ও চট্টগ্রামে ৭৭ শতাংশ মানুষ এমবিবিএস চিকিৎসকের সেবা পেয়েছেন।

ফার্মেসির ওষুধ বিক্রেতাকর্মীর কাছ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন সবচেয়ে বেশি বরিশাল ও সিলেট বিভাগের মানুষ, ৮ শতাংশ করে। এরপর ময়মনসিংহ ও রংপুরের ৭ শতাংশ করে, চট্টগ্রামে ৬, ঢাকায় ৪, খুলনায় ৩ শতাংশ ও রাজশাহীতে ১ শতাংশ মানুষ এ ধরনের চিকিৎসা পেয়েছেন।