ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নতুন রাজনৈতিক দলের হাল ধরতে তথ্য ও সম্প্রচার এবং ডাক টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন নাহিদ ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে নতুন দলটির আহ্বায়ক পদে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলো।
নতুন দলের ঘোষণা আসবে আগামী শুক্রবার, যেটি আগেই জানানো হয়েছে। ওই দিন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বড় গণজমায়েত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে সদস্য সচিব হিসেবে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনার পর নিশ্চিত হয়েছে আখতার হোসেনের নাম। এখন পর্যন্ত দলটির নাম ও প্রতীক নির্ধারিত না হলেও নাহিদ-আখতারের কাঁধে ভর করেই আগামী নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে ছাত্রদের দলটি।
সূত্রমতে, দলটির সম্ভাব্য নাম হিসেবে ‘ছাত্র-জনতা পার্টি’, ‘জাতীয় বিপ্লবী শক্তি’, ‘বিপ্লবী জনতা সংগ্রাম পার্টি’ ও ‘বৈষম্যবিরোধী নাগরিক আন্দোলন’ ইত্যাদি আলোচনায় এসেছে। তবে নাম ইংরেজিতে দেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া দলটি ‘মুষ্টিবদ্ধ হাত’, ‘হাতি’, ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ ও ‘শাপলা’, ‘ইলিশ’ এই পাঁচটি থেকে যেকোনো একটি প্রতীকে নিবন্ধন নিয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারে বলে জানা গেছে। দলের নাম, প্রতীক, মূল পদগুলোয় কারা আসবেন, প্রাথমিক কমিটিতে কারা থাকবেন, তা নিয়ে এখনো ‘ক্লোজডোর আলোচনা চলমান রয়েছে।
জানা যায়, দলটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব ছাড়াও মূল পদ থাকবে আরও সাতটি। এর আগে মূল চার পদে কাকে রেখে কাকে রাখা হবে নিয়ে আলোচনা শুরু হলে মূল পদের সংখ্যা বাড়ানো হয়। সে সময় সদস্য সচিব পদে নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদের নাম আলোচনায় ছিল। এ সময় জাতীয় নাগরিক কমিটিতে ‘বিভাজনে’র গুঞ্জন শোনা যায়। পরে আখতারকেই সদস্য সচিব পদে রাখার ব্যাপারে ‘সমঝোতা’ হয়।
জাতীয় নাগরিক কমিটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নেতা বলেন, আখতারকে সদস্য সচিব পদে রাখা হবে না বিষয়ে গুঞ্জন ছিল। এ নিয়ে নাগরিক কমিটিতে অনেক আলোচনা হয়েছে। মানুষ ভেবে নিয়েছিল গঠনের আগেই দলে হয়তো ভাঙন ধরেছে। কিন্তু পরে সর্বসম্মতিক্রমে আখতার হোসেনের নামই চূড়ান্ত হয়েছে।
সূত্র জানায়, আত্মপ্রকাশের দিন ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হবে। পরে সেই কমিটিকে বর্ধিত করে ৩০০ সদস্যবিশিষ্ট করা হতে পারে। এ সময় জাতীয় নাগরিক কমিটির উপজেলা পর্যায়ের ৩২৮টি কমিটি থেকে নতুন রাজনৈতিক দলে যুক্ত হবেন নেতারা। শুরুতে আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, মুখ্য সংগঠক এবং মুখপাত্র এ চারটিকে শীর্ষ পদ হিসেবে রেখে দল গঠনের কথা ভাবা হলেও এর সঙ্গে আরও পাঁচটি পদ যুক্ত হবে বলে জানা গেছে। এরই মধ্যে ৭০ জনকে বাছাইসহ শীর্ষ ৯টি পদের জন্য ৯টি নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, দলটির মুখপাত্র এবং মুখ্য সংগঠক পদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এবং নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম থাকার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া শীর্ষ পদগুলোতে নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, তাসনিম জারা ও আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম সদস্য সচিব রাফে সালমান রিফাত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল, মুখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ থাকবেন বলে জানা গেছে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন নাহিদ ইসলাম।
পদত্যাগের পর সংবাদ সম্মেলনে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা পূরণে সরকারে থাকার চেয়ে রাজপথে বেশি ভূমিকা পালনে উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছি। ছাত্র-জনতার যে শক্তিতে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়েছে, সেই শক্তিকে সংহত করতে আমি মনে করেছি যে, সরকারের থেকে সরকারের বাইরে রাজপথে আমার ভূমিকা বেশি হবে এবং আমার বাইরে যারা আমাদের সহযোদ্ধা রয়েছেন, তারাও এটিই চান। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘গত ছয় মাসে আমি এবং আমরা আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করেছি কাজ করে যাওয়ার। দুটি মন্ত্রণালয়ের বাইরেও অনেক অতিরিক্ত দায়িত্ব আমাদের পালন করতে হয়েছে। চেষ্টা করেছি এবং মন্ত্রণালয়গুলোতেও কিছু কাজ করেছি, সেই কাজের ফলাফল হয়তো সামনে জনগণ পাবে। ছয় মাস খুবই কম সময়, তবুও আমি চেষ্টা করেছি, আমার কাজ ও তার ফল জনগণ মূল্যায়ন করবে। আজ থেকে মূলত আমি সরকারের কোনো দায়িত্বে নেই।’ এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে নাহিদ বলেন, ‘আমার পরে কে দায়িত্ব নেবে, সেটা উপদেষ্টা পরিষদই ঠিক করবে।’
ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্বে আসা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং মাহফুজ আলমও একই পথ অনুসরণ করবেন কি না, সেই প্রশ্নে নাহিদ বলেন, ‘আমি আমার জায়গা থেকে মনে করেছি, আমাকে বাইরে প্রয়োজন। এখনো আমাদের গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়িত হয়নি। বিচার এবং সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই সরকার গঠিত হয়েছিল, ছাত্ররা এসেছিল, সেই প্রতিশ্রুতি পূরণে অন্য যে দুজন রয়েছেন, তারা মনে করছেন সরকারে তাদের এখনো দায়িত্ব রয়েছে। তারা এখনো সরকারে থেকেই জনগণকে সার্ভ করবেন। তারা যদি রাজনীতি করার প্রয়োজন বোধ করেন, তখন হয়তো সরকার ছেড়ে দেবেন।’
নাহিদ বলেন, ‘নতুন যে রাজনৈতিক শক্তি এবং দল গঠন হচ্ছে, সেখানে অংশগ্রহণ করতে আমার অভিপ্রায় আছে। জনগণের সঙ্গে মিশে আবারও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং আমাদের যে গণঅভ্যুত্থান, এর যে প্রতিশ্রুতি, সেটা বাস্তবায়নে মাঠে থেকে কাজ করার লক্ষ্যেই আমি সরকার থেকে পদত্যাগ করেছি।’
দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা আছে কি না এমন প্রশ্নে এই তরুণ নেতা বলেন, ‘আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিলই। আমরা সেই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটানোর চেষ্টা করেছি সবসময় এবং এখানে সীমাবদ্ধতা ছিল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ছিল, আমরা এসে এই ব্যুরোক্রেসিকে যেভাবে পেয়েছি, এখানে পুলিশের আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি হয়েছে আন্দোলনের পরে এবং একই সঙ্গে জুলাইয়ের যারা গণহত্যাকারী তাদের গ্রেপ্তার, বিচারের বিষয়টা, সে বিষয়ে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা কাজ করেছি।’
এদিকে নতুন দলের আত্মপ্রকাশকে কেন্দ্র করে গত সোমবার জাতীয় নাগরিক কমিটি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা রাজধানীর বাংলা মোটর রূপায়ণ টাওয়ারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। এ সময় আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের পরিবার, আহত ব্যক্তিরা, বিভিন্ন সময়ে নানা কারণে যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, প্রবাসীদের প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ ধর্ম ও রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বাংলাদেশের সব জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ছাত্রদের রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ নিয়ে সারা দেশের মানুষের যে অপেক্ষা, আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি তার অবসান হচ্ছে। এদিন যে দলটির আত্মপ্রকাশ হতে যাচ্ছে, সে দলে বাংলাদেশের প্রচলিত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মতো ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ এবং দলীয় স্বার্থের বাইরে একমাত্র দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন হতে যাচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক কমিটি ১৫ দিন ধরে ‘আপনার চোখে নতুন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি জনমত জরিপ ক্যাম্পেইন করেছে। সেখানে দেশের সর্বস্তরের প্রায় দুই লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন। সব পেশার মানুষের মতামতের বহিঃপ্রকাশ আমরা এই জরিপের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছি। নতুন রাজনৈতিক দলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক দলের নাম সম্পর্কেও মানুষ মতামত ব্যক্ত করেছেন। রাজনৈতিক দলের কাছে মানুষের প্রত্যাশা হচ্ছে দখলদারিত্ব ও মাফিয়াতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা।
নবগঠিত দলের কাঠামো ও নেতৃত্ব সম্পর্কে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে আখতার বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের দলের নাম চূড়ান্ত হয়নি। ২৮ তারিখে আমরা আহ্বায়ক কমিটির মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করব। সেদিনই দলের নাম, কাঠামো এবং নেতাদের নাম আমরা জানাতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, নবগঠিত দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ভোটের মাধ্যমে দলীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেতৃত্ব চূড়ান্ত করা হয়েছে। সামনের দিনেও সদস্যদের সরাসরি ভোটেই এ দলটির নেতা নির্বাচন করা হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, যেসব তরুণ ছাত্ররা অভ্যুত্থানে ভূমিকা রেখেছে, গত ছয় মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের সংগঠিত করেছে। এ ছাড়া যারা বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের সদস্য ছিলেন, অভ্যুত্থানে ভূমিকা রেখেছেন এবং দীর্ঘসময় লড়াই-সংগ্রামে জড়িত ছিলেন, তাদের সংগঠিত করতে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠিত হয়। এবার সময় এসেছে এই নতুন সংগঠিত শক্তিটির আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দল হিসেবে হাজির হওয়ার। রক্তের মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন বাংলাদেশ গড়ার আকাক্সক্ষা সামনে নিয়ে এই দলটি কাজ করবে। এ দলটি ঐতিহাসিক দায় থেকে গঠিত হচ্ছে।