উচ্চ আদালত ২৭তম বিসিএসে নিয়োগ বঞ্চিত ১ হাজার ১৩৭ জনকে নিয়োগ দিতে বলেছে। এর ফলে তারা ১৬ বছর পর চাকরিতে যোগ দিতে যাচ্ছেন। যারা চাকরিতে যোগ দেবেন তাদের ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ ১৬ বছর আগে তাদের ব্যাচমেটরা যে তারিখে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন তারাও কাগজপত্রে একই তারিখে যোগ দেবেন। চাকরি করে কর্মকর্তারা এত দিনে যে বেতন, ইনক্রিমেন্ট, বোনাস, বাড়িভাড়া, পদোন্নতি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন চাকরি না করেও তারা এসব সুবিধা পাবেন। এককজনের ক্ষেত্রে এর পরিমাণ কয়েক লাখ টাকা। অর্থাৎ একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ দেনা শোধের আর্থিক চাপে পড়ছে রাষ্ট্র।
এর আগেও গত ১৪ আগস্ট ২৮তম থেকে ৪২তম বিসিএস পর্যন্ত নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছিলেন কিন্তু নিয়োগ পাননি, এ রকম ২৫৯ জনকে সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর বাইরেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিসিএসে নিয়োগ বঞ্চিতদের ধারণাগত জ্যেষ্ঠতা বা ভূতাপেক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এগুলোর সবই আদালতের নির্দেশনায় হয়েছে। ভুক্তভোগীরা আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালতের রায়ে সরকার তাদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়।
লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অথবা অন্যান্য কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তাদের কাজে যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশিক্ষণ শূন্য এসব কর্মকর্তা কতটা কার্যকরী হতে পারেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে খোদ প্রশাসনেই। সংশ্লিষ্ট ডেস্ক অফিসাররা জানিয়েছেন, প্রতিটি বিসিএস থেকেই এমন দু-চারজন কর্মকর্তা পাওয়া যায় তারা বিলম্বে চাকরিতে প্রবেশ করেন। কিন্তু ২৭ থেকে ৪২তম বিসিএসে এই সংখ্যাটা অনেক বেশি। দীর্ঘ সময় পরে যারা চাকরিতে যোগ দেন তারা অন্যদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন না। সংশ্লিষ্ট ব্যাচমেটরা যখন মাঠে কাজ করেন তখন তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হয়। এসব কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ শেষ করে এলেও অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের গ্রহণ করতে চায় না। কারণ তারা পিছিয়ে পড়া কর্মকর্তা। বাজেটের দিক থেকে ছোট মন্ত্রণালয় বা বিভাগ গ্রহণ করতে বাধ্য হলেও তাদের দুর্বল ডেস্কে বসিয়ে রাখে। যে ডেস্কে গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ নেই সেসব জায়গায় তাদের ডাম্পিং করে রাখা হয়।
১৬ বছর পর নিয়োগ পাওয়া এসব ব্যক্তিও যে খুব সহজেই সরকারের কাছ থেকে টাকা পেয়ে যাবেন বিষয়টা তেমন নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, আদালতের রায় অবশ্যই পালন করতে হবে। কিন্তু আদালত যদি সুনির্দিষ্ট করে রায়ে না বলে দেয়, কী কী আর্থিক সুবিধা তারা পাবেন। তবে এসব কর্মকর্তাকে আবার আদালতে যেতে হবে। তারা আর্থিক সুবিধা পাবেন কিন্তু এর জন্যও বছরের পর বছর ঘুরতে হবে। এখানে আদালত যদি চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি যারা এসব অন্যায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাদের শাস্তির আওতায় আনতে পারে তাহলেই এসব অপরাধ কমবে এবং সাধারণ মানুষের করের টাকার অপচয় হবে না।
২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারি ২৭তম বিসিএসের প্রথম মৌখিক পরীক্ষায় ৩ হাজার ৫৬৭ জন উত্তীর্ণ হন। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ মৌখিক পরীক্ষার ফল বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই বছরই দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষায় ৩ হাজার ২২৯ জন উত্তীর্ণ হন। পরে ২০১০ সালে তাদের চাকরিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে অনেকে দুই মৌখিক পরীক্ষাতেই উত্তীর্ণ হন। অনেকে প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও দ্বিতীয় মৌখিক পরীক্ষায় ফেল করেন। তারাই আদালতে যান।
২৭তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে যারা ২০১০ সালে নিয়োগ পেয়েছেন তারা এখন সরকারের উপসচিব। তারা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে সাধারণ মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার যে ১ হাজার ১৩৭ জনকে চাকরিতে নেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে তারা আগামী ৯০ দিনে কাজে যোগ দেবেন। এরপর তাদের প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হবে। বিভিন্ন ধাপের সেসব প্রশিক্ষণ নিতে নিতে তাদের সঙ্গী কর্মকর্তারা আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১৫ বছরে জনপ্রশাসনে বঞ্চিত ৭৬৪ জনকে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পদোন্নতি প্রাপ্তদের মধ্যে আছেন সচিব পদে ১১৯ জন, গ্রেড-১ পদে ৪১ জন, অতিরিক্ত সচিব পদে ৫২৮ জন, যুগ্ম সচিব পদে ৭২ জন এবং উপসচিব পদে চারজন কর্মকর্তা। যারা অবসরে গেছেন, তারা ‘ভূতাপেক্ষভাবে’ পদোন্নতি পাবেন। ২০০৯ সাল থেকে গত বছরের ৪ আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বঞ্চিত দাবি করে ১ হাজার ৫৪০ কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। তাদের মধ্য থেকে এই ৭৬৪ জনকে বাছাই করা হয়।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবীর মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৭ ব্যাচের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিব হওয়ার পথে। এই দীর্ঘ সময়ে চাকরিতে তারা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। ধাপে ধাপে এসব প্রশিক্ষণ নিতে হয়।
১৬ বছর পর যাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে এসব প্রশিক্ষণের সুযোগ তাদের আর নেই।
কিন্তু ভূতাপেক্ষ বিবেচনায় আদালতের রায়ে তাদের নিয়োগ লাভ চূড়ান্ত। অথচ যারা এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন তারা ধরাছাঁয়ার বাইরে। এখানে আর একটি পক্ষ হচ্ছে পাবলিক। তাদের করের টাকায় এসব বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হবে। ১৬ বছরের টাকা একসঙ্গে করে তারা হয়তো কম-বেশি একেকজন ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পাবেন। বঞ্চিতদের পদোন্নতি দিয়েও একইভাবে পাবলিক মানি অপচয় করা হয়েছে।
জনপ্রশাসনের একজন কর্মকর্তা জানান, এর আগেও কয়েকটি বিসিএস থেকে এ ধরনের কর্মকর্তা পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ তারা অন্যদের সঙ্গে চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। পরে আদালতে চ্যালেঞ্জ করে তারা চাকরি পেয়েছেন। এখন প্রশাসন ক্যাডারে যারা ১৬ বছর পর প্রবেশ করবেন ৩০ বছরের চাকরি জীবন শেষ করতে তাদের অবশিষ্ট থাকবে আর মাত্র ১৪ বছর। কাজের ধারাবাহিকতাবিহীন প্রশিক্ষণ শূন্য এই কর্মকর্তাদের কাছে সরকার কী সার্ভিস পাবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।