ফাইলে বন্দি গবেষণার অধিকার

গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত জমি না থাকায় মাঠপর্যায়ে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য বরাদ্দ করা পাশের জমি (বাণিজ্য মেলার পুরাতন মাঠ) বছরের পর বছর অযতœ-অবহেলায় পতিত থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা ব্যবহার করতে পারছেন না শেকৃবি শিক্ষার্থীরা। এতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে শিক্ষা লাভের সুযোগ বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কৃষি খাত এবং র‌্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

শেকৃবিতে চারটি অনুষদের অধীনে ৩৫টি বিভাগ নিয়ে বর্তমানে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্সে অধ্যায়নরত, যাদের প্রত্যেককে মাঠপর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে শুধু কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য ছোট একটি মাঠ থাকলেও অ্যানিমেল সায়েন্স ও ভেটেরিনারি মেডিসিন এবং ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের জন্য নেই পর্যাপ্ত গবেষণার স্থান।

১৯৩৮ সালে প্রায় ৩০০ একর জমি নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীনতম এই কৃষি বিদ্যাপীঠের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯২০ সালের ৩ জানুয়ারি প্রকাশিত কলকাতা গেজেট ১০৯ নম্বর ডিক্লারেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য মেলার পুরাতন মাঠটি দ্য বেঙ্গল এগ্রিকালচার ইনস্টিটিউটের অধীন, যা বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও হঠাৎ ওই জায়গায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। রাতারাতি উচ্ছেদ করা হয় প্রতিষ্ঠানটির একটি আবাসিক হল, মসজিদ ও কৃষি খামারসহ সংশ্লিষ্ট নানা স্থাপনা। এর আগে প্রতিষ্ঠানটির মতামত উপেক্ষা করে তাদের অধিগ্রহণকৃত ভূমিতে বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করে সরকার। ফলে ২৯৮.৪৮২ একরের এই কৃষি বিদ্যাপীঠ সংকুচিত হতে হতে ৮৭.৫১৯ একরে সীমিত হয়ে পড়ে।

জানা গেছে, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ না থাকায় ২০০১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার পর থেকে জমি বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিদ্যাপীঠটি। প্রতিষ্ঠানটির নামে বরাদ্দ করা জমি ও প্রায় বছর জুড়ে পতিত থাকার কারণে বাণিজ্য মেলার পুরাতন মাঠ গবেষণার জন্য সবসময় আলোচনায় ছিল। কিন্তু বাণিজ্য মেলা আয়োজনের অজুহাতে বরাবর এই দাবি ফিরিয়ে দেয় সরকার। তাছাড়া পাশের গণভবনের নিরাপত্তা, সচিবালয় নির্মাণ, পার্ক নির্মাণসহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনোটি বাস্তবায়ন হয়নি।

শেকৃবির প্রধান খামার ব্যবস্থাপক লুৎফুর রহমান বলেন, ‘এ বছর রবি মৌসুমে শুধু কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য ১৬ একর জমির প্রয়োজন ছিল, সেখানে আমাদের চাষাবাদযোগ্য জমির পরিমাণ অর্ধেক। এএসভিএম অনুষদের প্রাণীদের জন্য মিনি চিড়িয়াখানা রয়েছে। পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে প্রাণীগুলো প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এই অনুষদের শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও প্রদর্শনীর জন্য নেই কোনো অ্যানিমেল প্রোডাকশন ফার্ম ও চারণভূমি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের জন্য নেই কোনো পৃথক পুকুর। অনুষদটিতে ল্যাবনির্ভর গবেষণা চললেও মাছ চাষাবাদের বেসিক গবেষণার জন্য পুকুরের বিকল্প নেই।’

এদিকে নিজেদের মাঠ ফিরে পেতে গত অক্টোবরে মানববন্ধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা, টানানো হয় সাইনবোর্ড। মাঠটি স্থায়ীভাবে ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে প্রধান উপদেষ্টাসহ বিভিন্ন দপ্তরে দেওয়া হয়েছে চিঠি। তবে আশানুরূপ সাড়া না পাওয়ায় এবার কঠোর আন্দোলনের পথে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী নাহিদ আহমেদ বলেন, ‘এটি একটি টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি। এখানে রুমে বসে শুধু ক্লাস-পরীক্ষা নয়, মাঠে গবেষণা করে আমাদের ডিগ্রি নিতে হয়। কিন্তু জায়গার অভাবে ছাদে-টপে গাছ লাগতে হয়। আবার একই জমিতে প্রতিবছর একই ধরনের ফসল নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চলমান থাকায় রোটেশন করা সম্ভব হচ্ছে না, যা গবেষণা কার্যক্রমের জন্য আদর্শ নয়। এই ক্ষতি শুধু আমাদের নয়, দেশের কৃষি গবেষণার ক্ষতি।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেকৃবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘হারানো এ জমি উদ্ধারে আমরা একটা কমিটি করে দিয়েছি। তারা গণপূর্ত অধিদপ্তর, শিক্ষা উপদেষ্টা, প্রধান উপদেষ্টাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অবগত করেছে।’