তামিলনাড়ুতে ভাষার ‘লড়াই’

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন ডিএমকে এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মধ্যে তিন-ভাষানীতি নিয়ে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। তামিলনাড়–র রাজ্য সরকারের অভিযোগ, বিজেপি সরকার তামিল ভাষাভাষীদের ওপর জোরপূর্বক হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। যার জেরে কয়েক দিন ধরেই তামিলনাড়–তে ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। হিন্দিবিরোধী সেøাগানে সয়লাব হয়ে উঠেছে বাস, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানের দেয়াল। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন বলেছেন, তারা কেন্দ্রীয় সরকারের এই দুরভিসন্ধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত রয়েছেন। এরই মধ্যে তামিলনাড়–তে নথিবদ্ধ সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছেন তিনি। তবে ডিএমকের ডাকা সেই বৈঠক বয়কটের কথা জানিয়েছে বিজেপি।

তামিলনাড়–র হিন্দিবিরোধী আন্দোলনের একটা দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে। তবে সম্প্রতি এই বিতর্ক উসকে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। বেনারসে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি খোলাখুলিভাবে বলেন, নতুন শিক্ষানীতি (নেপ) বাস্তবায়ন না করলে তামিলনাড়– কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া শিক্ষা বরাদ্দের প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা পাবে না। ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসি বা নেপে বলা হয়েছে, ছাত্রছাত্রীদের তিনটি ভাষা (ইংরেজি, হিন্দি ও তামিল) শেখার ও শেখানোর সুযোগ বাধ্যতামূলকভাবে সব রাজ্যে থাকতে হবে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রীয় সরকার ও তামিলনাড়– রাজ্যের সরকারের মধ্যে মতবিরোধ চলছে। সম্প্রতি ধর্মেন্দ্র প্রধানের মন্তব্যের পর তামিলনাড়– কার্যত হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে।

তামিলনাড়– সরকার জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই তিন-ভাষা সূত্র মানবে না। কোনোভাবেই ঘুরপথে হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াসকে আমল দেবে না তারা। সম্প্রতি তামিলনাড়–র উপমুখ্যমন্ত্রী উদয়নিধি স্ট্যালিন বলেন, যে রাজ্যগুলো হিন্দি ভাষা গ্রহণ করেছে, তারা তাদের মাতৃভাষা হারিয়ে ফেলেছে। প্রয়োজনে তামিলনাড়– ভাষা যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে। কিছুদিন আগে তামিলনাড়–র মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, ত্রিভাষা ১৯৬৮ সাল থেকে ভারতীয় শিক্ষানীতির অংশ। ধারাবাহিক শিক্ষানীতির অংশ হওয়া সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যবশত এটি প্রয়োগ করা হয়নি। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ভারতীয় ভাষাগুলোর পদ্ধতিগত শিক্ষা কমছে। কেন তামিলনাড়– একমাত্র রাজ্য হিসেবে তিন-ভাষানীতির বিরোধিতা করছে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে উদয়নিধি স্ট্যালিন বলেন, ‘কারণ আমরা জানি যে হিন্দি গ্রহণ করলে মাতৃভাষা হারিয়ে যাবে, যেমনটা অন্য রাজ্যগুলোর সঙ্গে হয়েছে। আমরা তা হতে দেব না। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি তার বাবা ও মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের পাশে দাঁড়ান।’

জাতীয় শিক্ষানীতির অধীনে কেন্দ্রের চাপিয়ে দেওয়া হিন্দি ভাষা নিয়ে কয়েক দিন ধরেই দক্ষিণী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন তোপ দাগছেন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, হিন্দিকে জোরের সঙ্গে সামনে আনতে গিয়ে এই আঞ্চলিক ভাষাগুলোর মৃত্যু হচ্ছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ায় কয়েক যুগ ধরে ২৫টি উত্তর ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে। স্ট্যালিন আরও বলেন, উত্তর প্রদেশ ও বিহার কখনোই হিন্দি ভাষায় প্রাণকেন্দ্র ছিল না। তাদের বর্তমান ভাষা হচ্ছে অতীতের ধ্বংসাবশেষ। দেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে মুছে ফেলতে হিন্দিকে দেশের ভাষা করে তোলার চেষ্টা চলছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভাষাগত ঐক্যের নামে দেশের ভাষাগত বৈচিত্র্যকে বিনষ্টের পরিকল্পিত চক্রান্ত করছে বিজেপি। ডিএমকে প্রধান স্ট্যালিন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, রাজ্যের শিক্ষানীতিতে যে দ্বিভাষা ব্যবস্থা রয়েছে, তাই বজায় থাকবে, ত্রি-ভাষিক মাধ্যমের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

১৯৩৭ সালে চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারি মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর, ১৯৩৮ সালে তামিলনাড়–র মাধ্যমিক স্কুলে হিন্দি শেখানো চালুর সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়। তবে সঙ্গে সঙ্গেই পেরিয়ার ও জাস্টিস পার্টি হিন্দিবিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। ডিএমকের প্রতিষ্ঠাতা আন্নাদুরাই আন্দোলনকে সমর্থন করেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৪০ সালে সরকার এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে। ১৯৪৭ সালে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার সব রাজ্যকে অনুরোধ করে, তারা যেন স্কুলে বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি শেখানোর সিদ্ধান্ত নেয়। আবার পেরিয়ার-আন্নাদুরাইদের আন্দোলনে তা ব্যর্থ হয়। ১৯৫০ সালে ভারতীয় সংবিধানে ইংরেজি ও হিন্দিকে সরকারি ভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৬৭ সালের নির্বাচনে ডিএমকে তামিলনাড়–তে ক্ষমতায় আসার পর দলটি দুই ভাষানীতি নিয়ে আইনপ্রণয়ন করে।