তুরস্কের ইস্তানবুল শহর কখনো ঘুমায় না। আমার বাসস্থান বালাত ইস্তানবুলের মতো সদা জাগ্রত শহর নয়। রাত ১২টা থেকে সকাল পর্যন্ত বালাত এতটাই নিস্তব্ধ থাকে যে, মনে হয় রাস্তায় একটি পিন পড়লেও শোনা যাবে। মাঝে মাঝে শুধু রাস্তায় কুকুর বিড়ালের ধাওয়া করার শব্দ শোনা যায়। তবে এখানে প্রথম রমজান থেকে শেষ পর্যন্ত সাহরির সময়টি আলাদা। সাহরির সময় শুরু হয় বুম-কাদা, বুম-কাদা, বুম-বুম-বুম আওয়াজে।
এখানে আসার পর প্রথম বারের মতো সাহরির সময় এই শব্দ শুনে বিভ্রান্ত হয়েছিলাম। তবে আট বছর পার করার পর এই পুনরাবৃত্তিমূলক ও খানিকটা তালহীন ড্রামের শব্দ এখন চেনা ও প্রত্যাশিত হয়ে গেছে। এটি এক পুরনো ঐতিহ্য। ড্রামার বা ঢোলওয়ালার কাজ হলো পাড়া-প্রতিবেশীদের সাহরি খাওয়ার জন্য জাগিয়ে তোলা। আধুনিক শহরগুলোতে এটি প্রায় হারিয়ে গেলেও পুরনো ও আবাসিক এলাকায় এটি এখনো টিকে আছে।
আমি নরওয়েতে বেড়ে উঠেছি। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর আমার জীবনের প্রথম রমজানগুলো সেখানে কেটেছে। সেখানে আশপাশে একজন মুসলমানও ছিল না। তাই এক মাস ধরে দিনের বেলায় খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকা আমার কাছে খুবই কষ্টকর ছিল। তবে এখানে এসে আমি দ্রুত শিখলাম, রমজান সংযমের মাস। রমজান ভাগাভাগির মাস, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর মাস। ইফতার মানে শুধু রোজা ভাঙা নয়; বরং এটি এক পারিবারিক উৎসব, যেখানে সবাই একত্র হয়। ইফতারের পর শিশুরা খেলাধুলায় মেতে ওঠে। আর বড়রা ইবাদত-বন্দেগি শেষে অনবরত চা পান করতে থাকে এবং খেজুর ও বাদাম খায়। এভাবেই কাটে রমজানের ত্রিশ দিন।
এখানে আমি প্রথম ইফতার করেছিলাম সুলতান আহমদ মসজিদ এবং হাজিয়া সোফিয়ার মধ্যে থাকা চত্বরে। এটি এক সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিলনায়তন কেন্দ্র ছিল। ১৪৫৩ সালে তুর্কিরা ইস্তানবুল বিজয়ের পর এটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করে। আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক এটিকে জাদুঘরে রূপান্তর করেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর আগে এটি আবার মসজিদে পরিণত হয়েছে।
সন্ধ্যার এক ঘণ্টা আগেই আমরা সেখানে পৌঁছাই। তখনই দেখি, পুরো বাগান ও চত্বর নানা দলে দলে লোকজন দিয়ে ভরা, যারা নীরবে ও ধৈর্যের সঙ্গে মুয়াজ্জিনের আজানের অপেক্ষা করছে। যদিও সূর্যাস্ত হতে তখনো দেরি, তবুও বেশিরভাগ মানুষ ইতিমধ্যেই তাদের খাবারের আয়োজন সম্পন্ন করেছে। টেবিল বা বিছানো চাদরে বাহারি খাবার, পানির বোতলের ছিপিও খুলে রাখা হয়েছে, যেন আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আর সময় নষ্ট করতে না হয়।
আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যেই বদলে গেল। আমরা কয়েকটি মেজেজ (তুর্কি স্টার্টার) এনেছিলাম, সঙ্গে একটি স্যুপ ও তাজা রুটি কিনেছিলাম। আশপাশের মানুষজনও খাবার, পানীয় ভাগাভাগি করছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শিশুরা খেলায় মেতে উঠল, আর বড়রা কাঠের চুলায় চা বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মাত্র কিছুক্ষণ আগেও যে পরিবেশ ছিল শান্ত ও থমথমে, মুহূর্তের মধ্যে সেটি হয়ে উঠল প্রাণবন্ত ও আনন্দময়। যেন কোনো এক জাদুর ছোঁয়ায় সব বদলে গেল।
কয়েকদিন পর আমরা গিয়েছিলাম বেসিকতাসে, যা মূলত ফুটবল দল হিসেবে বিখ্যাত। তুরস্কের তিনটি প্রধান ক্লাবের একটি এটি। সেখানে গিয়ে দেখি, বেসিকতাস ক্লাবের অন্যতম এক সমর্থক গোষ্ঠী একটি উন্মুক্ত ইফতার আয়োজন করেছে। এই গ্রুপটি বেশ মুক্ত চিন্তাধারার। স্বেচ্ছাসেবকদের দান করা খাবার দিয়ে তারা দীর্ঘ টেবিল সাজিয়ে রেখেছে, সেখানে যে কেউ এসে বিনামূল্যে ইফতার করতে পারে। ছোট-বড়, ফুটবলপ্রেমী বা ফুটবলপ্রেমী নয়, প্রগতিশীল বা রক্ষণশীল, সবার জন্যই এটি উন্মুক্ত। খাবার বলতে ছিল এক বাটি স্যুপ, এক প্লেট স্ট্যু, কিছু বুলগুর এবং এক টুকরো রুটি। অচেনা মানুষদের সঙ্গে বসে খাওয়া ও গল্প করার অসাধারণ এক অনুভূতি ছিল এটি।
তুরস্কে সাধারণত ইফতার শুরু হয় এক বাটি স্যুপ দিয়ে। এরপর পরিবেশন করা হয় সালাদ এবং এক ধরনের মজাদার খাবার, যা সাধারণত ভাত বা বুলগুরের সঙ্গে খাওয়া হয়। ইফতারের সময় একটি বিশেষ ধরনের রুটি খাওয়া হয়, যা শুধুমাত্র রমজান মাসে পাওয়া যায়। সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা আগে থেকেই রুটির দোকানগুলোর সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়, যেন সবাই গরম গরম রুটি নিয়ে ইফতার করতে পারে। রমজানের আরেকটি বিশেষ মিষ্টান্ন হলো গুল্লাচ। এটি চালের গুড়ার সঙ্গে মিষ্টি ও দুধ ভিজিয়ে তৈরি করা হয় এবং বাদাম দিয়ে সাজানো হয়। এটি শুধুমাত্র রমজান মাসেই পরিবেশন করা হয়।
মেজ বিদার বারগুম থেকে ভাষান্তর আতিকুর রহমান