ইসলামী ব্যাংকে যোগ্য পরিচালনা পর্ষদকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন গ্রাহকরা। তারা বলছেন, ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসলামী ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ অত্যন্ত দক্ষ, সৎ, আদর্শ ব্যাংকিং জ্ঞানসমৃদ্ধ এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছিল। যার সুফল আমানতকারী, গ্রাহক, বিনিয়োগ গ্রহীতারা ভোগ করেছিল এবং ব্যাংকটি দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যাংকের আসন দখল করে সাফল্যের শ্রেষ্ঠ শিখরে পৌঁছেছিল। পক্ষান্তরে পতিত স্বৈরাচার সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এস আলম গ্রুপ কর্তৃক ব্যাংক লুটেরার দখলে পড়ার পরে তার অদক্ষ ও অযোগ্য ছেলেকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। পরিচালনা পর্ষদ অত্যন্ত অসৎ এবং দুর্নীতিবাজদের হাতে চলে যায়। অযোগ্য ও দুর্বল পরিচালনা পর্ষদ দ্বারা পরিচালনার কারণে এ সাফল্যম-িত ব্যাংকটি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। এতে ব্যাংকের কার্যক্রম চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যাংকের সুনামহানি ঘটে। ব্যাংকের বিশাল সংখ্যক বিদেশি শেয়ার হোল্ডার তাদের শেয়ার বিক্রি করে চলে যায়। ব্যাংকের পরীক্ষিত ও যোগ্য পরিচালনা পর্ষদকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানান গ্রাহকরা।
গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক আবদুল হক, ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের যুগ্ম-আহ্বায়ক ও ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পিএলসি সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাসেম হায়দারসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমরা ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকরা গত ১০ বছরের অবৈধ দখলদারিত্ব দূর করে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং ব্যাংকটিকে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে চাই। ইতিমধ্যে আমরা এ ফোরামের উদ্যোগে গত বছরের ২৪ আগস্ট ঢাকার একটি হোটেলে ইসলামী ব্যাংকের কয়েকশ গ্রাহকের উপস্থিতিতে একটি সফল সমাবেশের আয়োজন করেছি। সেই সমাবেশের কিছু সুপারিশ এবং গত ৮ অক্টোবর বনানীর একটি রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত অন্য একটি সমাবেশের সুপারিশের আলোকে আমাদের গ্রাহক ফোরামের পক্ষ থেকে আহ্বায়কসহ একদল প্রতিনিধির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছি। আমাদের এ কর্মসূচি আমরা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে চাই, যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্লাসিফাইড গ্রাহকদের সমস্যার সমাধান এবং ব্যাংকের ডিপোজিট বৃদ্ধিতে আমরা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারি।
বক্তারা বলেন, ইসলামী ব্যাংক এদেশের উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে এক আস্থা, নির্ভরতা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক ছিল। মানসম্পন্ন গ্রাহক সেবা, যথাযথ আইনের ভিত্তিতে ব্যাংক পরিচালনা, দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে শীর্ষে অবস্থান, ক্ষুদ্র-মাঝারি এবং বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী আয় প্রাপ্তিতে অগ্রগামী থাকায় ইসলামী ব্যাংক দেশের গ্রাহকদের আস্থার শীর্ষে অবস্থান করছিল। আমরা এই ব্যাংকের গ্রাহক হিসেবে নিজেদের অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মনে করতাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পতিত স্বৈরাচারী সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ২০১৭ সালে এস. আলম গ্রুপ সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ডিজিএফআইয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি এবং পরিচালকদের ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে এনে জোরপূর্বক ব্যাংকের শেয়ার এস আলম গ্রুপের দখলে নেয় এবং ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে, যা বিগত ৪০ বছর ধরে বহু যতেœ গড়ে তোলা ব্যাংকটিকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে গ্রাহকদের পথে বসিয়েছে এবং আমাদের মতো সৎ ও নিষ্ঠাবান বিনিয়োগকারীদের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত ও স্থবির হয়ে পড়া ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে যথাসময়ে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল না পাওয়ায় ব্যবসা বা শিল্প সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারেনি, নিয়মিত এলসি করতে পারেনি এবং বিনিয়োগকারীরা যথাসময়ে ও নিয়মিতভাবে কিস্তি পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, যার দায়ভার সম্পূর্ণ ব্যাংকের কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। অথচ এসব বাস্তব পরিস্থিতির পরেও কিছু কিছু ব্যাংক কর্মকর্তা আমাদের গ্রাহকদের ব্যাংকের টাকা আদায়ের লক্ষ্যে যে ধরনের অমানবিক আচরণ করেছে তা কোনো অবস্থাতে দীর্ঘদিন ধরে একজন সৎ নিষ্ঠাবান বিনিয়োগকারী মেনে নিতে পারেননি।
বক্তারা বলেন, আমরা ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম-এর সদস্যরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ইসলামী ব্যাংক দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা, ব্যবসায় স্থবিরতা কাটিয়ে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনবে। ইসলামী ব্যাংকের সুনাম উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের সংকট থেকে উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। গ্রাহক হয়রানি বন্ধ করা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু করে ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগকারী এবং গ্রাহকদের আস্থার সংকট দূর করে ব্যাংকের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।