৭ মাস ধরে শরীরে আড়াইশ স্প্লিন্টার

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রায় সাত মাস ধরে আড়াইশ গুলির স্প্লিন্টার শরীরে নিয়ে দূর্বিষহ দিন পার করছেন সুজন (৪৪)। তিনি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার আকালু গ্রামের মৃত আনছার আলীর ছেলে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আহত অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকায় নিয়মিত চুলা জ¦লে না ঘরের। আত্মীয়দের সাহায্য-সহযোগিতায় খেয়ে না খেয়ে পার হচ্ছে দিন। অর্থাভাবে চিকিৎসা হচ্ছে না আহত সুজনসহ তার প্যারালাইসড মায়ের। বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে তিন সন্তানের পড়ালেখা।

প্রাইমারিতে পড়া অবস্থায় ৩০ বছর আগে বাবাকে হারান তিনি। পরিবারের হাল ধরতে তখন পড়াশোনা বন্ধ করে রিকশা চালানোর উদ্দেশে পাড়ি জমান ঢাকায়। রিকশা চালানোর পাশাপাশি স্থানীয় শ্রমিক দলের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন তিনি। আহত হওয়ার আগে তিনি রিকশা ছেড়ে দিয়ে ঢাকার বাড্ডা এলাকায় ভাড়ায় সিএনজি চালাতেন।

গত ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের দিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন তিনি। রাজধানীর বাড্ডায় সকাল ১০টার দিকে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্র্ষণ শুরু করে। পুলিশের গুলিতে পাশের এক সহযোদ্ধা মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লে সুজন তাকে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে গেলে তিনিও পুলিশের ছোড়া গুলিতে মারাত্মক আহত হন। তাৎক্ষণিক অচেতন হয়ে পাশর্^বর্তী একটি দেয়ালের পাশে পড়ে যান তিনি। পুলিশের গুলি চলমান থাকায় তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ছয় ঘণ্টা পর বিকেল ৪টার দিকে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিলেও অতিরিক্ত রোগী থাকায় তাকে ভর্তি করা যায়নি। পরে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে রাত ৩টার দিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১২ দিন চিকিৎসা নিয়েও উন্নতি না হওয়ায় উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ঘাটাইল সিএমএইচে চিকিৎসা নেন তিনি। সেখানে তার শরীর থেকে ৩৯টি গুলি বের করা হয়। কিন্তু এখনো তার শরীরে প্রায় আড়াইশ গুলির স্প্লিন্টার রয়ে গেছে। এর কারণে তিনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। ক্র্যাচে ভর দিয়ে একটু হাঁটলেই পরোক্ষণেই শরীরের ব্যথা বেড়ে যায়। এখন পর্যন্ত তিনি পরিবারের হাল ধরতে না পারায় অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে তাদের।

আহত সুজনের স্ত্রী নূপুর বেগম বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট সংসারে একটি টাকা ও কোনো খাদ্যসামগ্রী ছিল না। খবর পেয়ে বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় ৮০০ টাকা সংগ্রহ করে স্বামীকে উদ্ধার করার জন্য ঢাকায় যাই। ওর আহত হওয়ার পর থেকে সংসারে কোনো আয় নেই। বর্তমানে আমার শ^শুরবাড়ি এলাকার বিভিন্ন জনের কাছ থেকে হাত পেতে চেয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি। এমনও দিন যাচ্ছে চুলায় আগুন জ¦লে না। এমন অবস্থায় আমার তিন সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং আমার স্বামীসহ প্যারালাইসড শাশুড়ির খাবার ও ওষুধও জোগাড় করতে পারছি না। উপজেলা থেকে আমরা কিছু সাহায্য পেয়েছিলাম। আমাদের শুধু বেঁচে থাকার জন্য সবার সাহায্য কামনা করছি।’

আহত সুজন বলেন, ‘আমি দরিদ্র হলেও অন্যায়-অত্যাচার অবিচার সহ্য করতে পারি না। গত ৫ আগস্টের আগেও আমি অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে অংশ গ্রহণ করেছি। আমি বিএনপির একজন কর্মী। সকাল ১০টার দিকে পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশের ছররা গুলির ২৯৬টি স্প্লিন্টার আমার শরীরে লাগে। পরের দিন সকালে টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আমার জ্ঞান ফেরে। আমার শরীরে এখনো প্রায় আড়াইশ গুলির স্প্লিন্টার রয়েছে। আমি চলাফেরা করতে পারি না। ক্র্যাচের মাধ্যমে একটু হাঁটলেও ব্যথা বেড়ে যায়। এমন অবস্থায় আমার উন্নত চিকিৎসা ও আর্থিক সহযোগিতা দরকার।’

ভূঞাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পপি খাতুন বলেন, ‘নিহত ও আহতদের পরিবারকে সরকারি ও ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতা প্রদান করে আসছি। সরকারিভাবে এখনো আহতের কর্মসংস্থানের কোনো নির্দেশ আসেনি। তবে আহত পরিবারগুলো যাতে কোনো সমস্যায় না পড়ে সে ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় কাজ করছে।’