উন্নয়ন বরাদ্দ কমল ৪৯ হাজার কোটি টাকা

রেকর্ড কাটছাঁট হয়েছে উন্নয়ন বাজেটে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে বাদ গেল ৪৯ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ। এর আগে কখনো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এত বেশি কাটছাঁট হয়নি। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে গতকাল ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকার সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা আরএডিপি অনুমোদিত হয়, যা মূল এডিপির তুলনায় ৪৯ হাজার কোটি টাকা কম। এমনকি করোনা অতিমারির সময়েও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এত বেশি কাটছাঁট হয়নি। উন্নয়ন বরাদ্দ এত বেশি হ্রাস পাওয়ার পেছনে মূলত পাঁচটি বিষয় ভূমিকা রেখেছে। এগুলো হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় কমিয়ে দেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকারের কড়াকড়ি, অদক্ষতায় সময়মতো কাজ করতে না পারা এবং পুরনো সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া।

গতকাল সোমবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত এনইসি বৈঠকে সংশোধিত এডিপি অনুমোদিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টা ও এনইসি চেয়ারপারসন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠক শেষে ব্রিফিং করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ।

ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘চলতি অর্থবছর আমরা চাইছি আরএডিপি ছোট থাকুক। কেননা অনেক বড় বরাদ্দ দিয়ে ব্যয় করতে না পারলে সেটি ভালো দেখায় না। সেই সঙ্গে এবার বাজেট ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসছে। আগে থেকেই রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় ঘাটতি বেশি রেখে বরাদ্দ দেওয়া হবে না।’

তিনি আরও বলেন, সব প্রকল্প পিএমআইএস সফটওয়্যারে অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। সেখানে থাকলে কোনটার কী অবস্থা তার আপডেট জানা যাবে। যদি কোনো প্রকল্পের আপডেট না থাকে, তাহলে অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থছাড় করবে না। এ ছাড়া প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘আগে কীভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের নেতিবাচক মতকে ইতিবাচক করা হতো, সেটি আমরা সবাই জানি। এমনকি বাড়ি করতেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র দিতে অনিয়ম হয়েছে। সেগুলো এখন কঠোরভাবে দেখা হবে।’

এ সময় জানানো হয়, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে মোট বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা (স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বরাদ্দ ছাড়া)। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ কোটি টাকা। কিন্তু সংশোধিত এডিপিতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে ২ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে বরাদ্দ কাটছাঁট হয়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিলের বরাদ্দ দেওয়া হবে ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে ৮১ হাজার কোটি টাকা।

মূল এডিপিতে চলমান প্রকল্প ছিল ১ হাজার ৩৫২ প্রকল্পটি। এখন সংশোধিত এডিপিতে বেড়ে প্রকল্প সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩৭টি। এ ছাড়া অননুমোদিত নতুন প্রকল্প কমে হয়েছে ৭৭০টি, যা মূল এডিপিতে ছিল ৯১০টি।

সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া পাঁচটি খাতের মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৪৮ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ¦ালানি খাতে ৩১ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা, শিক্ষায় ২০ হাজার ৩৪৯ হাজার কোটি, গৃহায়ন ও কমিউনিটি সুবিধাবলিতে ১৯ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৬ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা।

মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ (৩৬ হাজার ১৫৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা)। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ বিভাগ (২১ হাজার ৪৭৫ কোটি ১১ লাখ টাকা) এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে (১৮ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা)।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) জানায়, গত অর্থবছরের এডিপিতে মোট বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। সংশোধিত এডিপিতে এসে ২০ হাজার ২৮২ কোটি টাকা কাটছাঁট করে মোট বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো খরচ করতে পেরেছিল ২ লাখ ৫ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ কমিয়ে যা দেওয়া হয়েছিল, তার ৮০ দশমিক ৯২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে মূল এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩ কোটি টাকা। অর্থবছরের মাঝপথে এসে ১৯ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা বাদ দিয়ে বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছিল এরও কম ২ লাখ ১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, অর্থাৎ বরাদ্দের ৮৫ শতাংশ।

২০২১-২২ অর্থবছরে মূল বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। এরপর ১৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকা বাদ দিয়ে সংশোধিত বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ লাখ ১০ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছিল ২ লাখ ৩ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা বা ৯২ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এ ছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছরে মূল এডিপি বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা কাটছাঁট সংশোধিত বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ লাখ ৯ হাজার ২৭২ কোটি টাকা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছিল ১ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা, যা বরাদ্দের ৮২ দশমিক ১১ শতাংশ।