কে শোনে কার কথা। আছে বিস্তর অভিযোগ, আছে দুর্নীতির দাগ। পতিত আওয়ামী আমলে ছিলেন অনিয়মের দাপুটে কর্মকর্তা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ভোল পাল্টিয়ে ফের ‘ধুন্ধুমার কৌশলী’ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) প্রকৌশল বিভাগের প্রধান হাবিবুর রহমান। দুর্নীতির কারণে তাকে সরাতে উচ্চতর আদালতে হয়েছে রিট। দুদকের মামলার আসামিও তিনি। অথচ তাকে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে বেবিচক।
গতকাল সোমবার বিকেলে বেবিচক কার্যালয়ে বোর্ডসভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। সূত্র জানায়, দু-তিন দিনের মধ্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে সরকারের কাছে আবেদন পাঠাবে। অভিযোগ রয়েছে, এই নিয়োগ পাওয়ার পেছনে অন্তত ১০ কোটি টাকা বাজেট করেছেন হাবিবুর রহমান।
বেবিচকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বোর্ডসভায় তাকে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সভায় কেউ কেউ তাকে আবার নিয়োগ দেওয়া ঠিক হবে না বলেও জানান। কিন্তু বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়োগ দেবেই বলে সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি আরও বলেন, হাবিবুর রহমান চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ করেন। অভিযোগ আছে, এই নিয়োগ পেতে তিনি অন্তত ১০ কোটি টাকার বাজেট করেছেন। একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সিদ্ধান্তে আমরা হতাশ।’
এদিকে দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। চলতি মাসের ২৩ তারিখে হাবিবুর রহমানের অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ আছে। টেন্ডারের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ৫ লাখ টাকার ঘুষ নিয়েও কাজ না দেওয়ায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতির অভিযোগে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিকীসহ বেবিচকের ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মালেকের নাম রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আসামিরা যেন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে না পারেন, সেজন্য বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে হাবিবুর রহমানের চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে আবার দুই বছরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে নানা মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। গত ২৬ জানুয়ারি সংস্থাটির চেয়ারম্যানের কাছে আবেদনও করা হয়েছে। আবেদনের নথি নম্বর-৩০.৩১.০০০। এ নিয়ে পুরো বেবিচকে তোলপাড় শুরু হয়েছে। গত সরকারের আমলেও সংস্থাটির সাবেক প্রধান আবদুল মালেকের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় দুদক তদন্ত করে। তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ম্যানেজ করে এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ভাগিয়ে নেন।
বেবিচক সূত্র জানায়, বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় প্রকৌশল বিভাগ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন বেবিচকের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ করেছেন। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় দুদক তদন্ত করে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বেবিচকের যত মেগা প্রকল্প রয়েছে, প্রায় সবগুলোতেই অর্থবাণিজ্য করেছেন তিনি। অনিয়ম হালাল করতে রাতারাতি টেন্ডারের নিয়ম পাল্টে ফেলেন। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিনা টেন্ডারে ১৬ কোটি টাকার কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। কক্সবাজার বিমানবন্দর উন্নয়নকাজে পিডি থাকার সময় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের প্রমাণ পায় মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। পরে তাকে পিডির পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
সিভিল সার্কেল-১-এর দায়িত্বে থাকাকালে দুর্নীতি ও খামখেয়ালিপনার প্রমাণ পাওয়ায় হাবিবুর রহমানকে বেবিচকের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করে অদৃশ্য কারণে তাকে একের পর এক মেগা প্রকল্পে পিডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। যার মধ্যে রয়েছে খুলনার খানজাহান আলী বিমানবন্দরের উন্নয়ন, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের উন্নয়ন, সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ ও নতুন টার্মিনাল নির্মাণ, চট্টগ্রামে শাহ আমানত বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণ এবং প্যারালাল ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ, রানওয়ে সম্প্রসারণ ও বিদ্যমান টার্মিনাল সম্প্রসারণ-নবরূপায়ণ এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন নির্মাণ ও রানওয়ে সম্প্রসারণ কাজ। এতসব অভিযোগ থাকার পরও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আওয়ামী লীগবিরোধী বলে প্রচার করতে থাকেন। প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি অবহেলিত ছিলেন বলে পদোন্নতি নেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষমেশ তিনি পদোন্নতি পেয়ে যান। প্রকৌশল বিভাগের সাবেক প্রধান আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় দুদক তদন্ত করে। তিনিও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তারিক আহমেদ সিদ্দিকীকে ম্যানেজ করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পান। এ নিয়েও বেবিচকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। গত ২৭ জানুয়ারি ৮১২ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় আবদুল মালেক ও হাবিবুর রহমানসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা করে দুদক। গত মঙ্গলবার মামলার আট আসামি যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। এত অভিযোগ থাকার পর গত ২৬ জানুয়ারি হাবিবুর রহমান দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে আবেদন করা হয়। ইতিমধ্যে বেবিচকের চেয়ারম্যানের বরাবর আবেদনটি দাখিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেতে করা আবেদনে হাবিবুর রহমানকে নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা আখ্যায়িত করা হয়েছে। তার দীর্ঘ কর্মজীবনে কক্সবাজার বিমানবন্দর (প্রথমপর্যায়) প্রকল্প, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদ্যমান রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তিবৃদ্ধীকরণ প্রকল্প, সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তিবৃদ্ধীকরণ প্রকল্পসহ আরও ছোট-বড় প্রকল্পের পরিচালক পদে নিষ্ঠা ও সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য আটটি ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, হাবিবুর রহমানের অবসর ছুটি বাতিল-পূর্বক ২৩.০৩.২৫ তারিখ থেকে ২২.০৩.২৭ পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে দরপত্রের কাজ পেতে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন এক ঠিকাদার। কিন্তু তিনি কাজ না পেয়ে অর্থ ফেরত চেয়েছেন। এ নিয়ে টালবাহানা চলতে থাকে কয়েক মাস। সবশেষে ঠিকাদার সিরাজুল ইসলাম ডিএমপির দুটি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তা ছাড়া দিয়েছেন উকিল নোটিস। পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা ও বেবিচক চেয়ারম্যানকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে জিডির বিষয়টি তদন্ত শুরু করেছে তদন্তকারী সংস্থা।
গত ১১ জানুয়ারি উত্তরা পূর্ব থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২২ সালে ১৪ মে বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে ঠিকাদারি কাজের জন্য অগ্রিম টাকা দিই। কাজ না দেওয়ার পাশাপাশি টাকা ফেরত না দিয়ে হাবিবুর রহমান আমাকে ঘোরাতে থাকেন। গত ৫ জানুয়ারি দক্ষিণখানের ‘একুশে ভোজ’ রেস্তোরাঁয় তাকে সামনে পেয়ে টাকা ফেরত চাইলে তিনি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে হুমকি দেন। গত ১২ জানুয়ারি প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমানকে পাঠানো উকিল নোটিসে বলা হয়, হাবিবুর রহমান বেবিচকের পিঅ্যান্ডডি কিউএস সার্কেলে একই পদে থাকাবস্থায় ৫ কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ দেওয়ার কথা বলে সিরাজুল ইসলামের কাছে ১০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করে। তার মধ্যে ৫ লাখ টাকা উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে দেওয়া হয়। বাকি ৫ লাখ টাকা কাজ দেওয়ার পর পরিশোধ করার কথা ছিল। কিন্তু এখনো কাজ বা টাকা ফেরত না দিয়ে সিরাজুল ইসলামকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছেন হাবিবুর রহমান। এজন্য থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নোটিসের জবাব না দিলে নিয়মিত মামলা করার কথা বলা হয় নোটিসে।