রোজার ইতিহাস

পৃথিবীর শুরুর যুগ থেকেই রোজার নিয়ম ছিল। একেক যুগে ছিল একেক ধরনের রোজা। তবে সব যুগে রোজার উদ্দেশ্য ছিল একটাই, বান্দাকে আল্লাহর নিকটবর্তী করা। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বের লোকদের ওপর। যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।’ (সুরা বাকারা ১৮৩) এই আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, পূর্ববর্তী উম্মতদের ওপরও রোজা ফরজ ছিল। তবে রোজার ধরন, শর্ত ও নিয়মে ছিল ভিন্নতা। যা পবিত্র কোরআনের অন্যান্য আয়াত ও হাদিস থেকে জানা যায়।

প্রথম নবী আদম (আ.)-এর যুগেও রোজা ছিল। আল্লাহতায়ালা আদম (আ.)-কে একটি বৃক্ষের ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। সেই বৃক্ষের ফল খাওয়া থেকে বিরত থাকাও ছিল এক ধরনের রোজা। তিনি তা থেকে বিরত থাকতে পারেননি। এজন্য আদম ও হাওয়া (আ.)-এর শরীর থেকে জান্নাতের পোশাক খুলে যায়। শরীরের রঙ হয়ে যায় কুৎসিত। অতঃপর আল্লাহতায়ালা তাদের আইয়ামে বিজের রোজা অর্থাৎ প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতে নির্দেশ দেন।

নুহ (আ.) বছরে দুদিন ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘নুহ (আ.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন ছাড়া সারা বছর রোজা রাখতেন।’ (ইবনে মাজাহ)

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় ছিল দাউদ (আ.)-এর রোজা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘রোজাসমূহের মধ্যে দাউদ (আ.)-এর রোজা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং পরবর্তী দিন রোজা রাখতেন না।’ (ইবনে মাজাহ)

মুসা (আ.) এর যুগেও রোজা ছিল। তাওরাত নাজিলের আগে মুসা (আ.)-কে চল্লিশ দিন রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া মুসা (আ.) আশুরার দিনে রোজা রাখতেন। কেননা এই দিনে আল্লাহতায়ালা বনি ইসরাইলকে শত্রুর কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি)

ঈসা (আ.)-এর যুগের রোজা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহতায়ালা মারইয়াম (আ.)-কে বলেন, ‘যদি মানুষের মধ্যে কাউকে তুমি দেখো তাহলে বলো, আমি দয়াময় আল্লাহর উদ্দেশে মৌনতা অবলম্বনের মান্নত করেছি। কাজেই আজ আমি কিছুতেই কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলব না।’ (সুরা মারইয়াম ২৬)

এখানে বলার অর্থ হলো ইশারা-ইঙ্গিতে বলা। মুখের দ্বারা বলা নয়। কেননা তাদের শরিয়তে রোজার অর্থই ছিল খাওয়া ও কথা বলা থেকে বিরত থাকা। (তাফসিরে আহসানুল বায়ান) কাতাদা (রহ.) বলেন, মারইয়াম (আ.) খাবার, পানীয় ও কথা-বার্তা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রোজা পালন করেছিলেন। (আততাফসিরুস সহিহ) কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, ইসলাম পূর্বকালে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মৌনতা অবলম্বন করা এবং কারও সঙ্গে কথা বলা থেকে বিরত থাকা রোজা ও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। (ইবনে কাসির)

রমজানের রোজা ফরজ হয় দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে। এর আগেও রাসুল (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম আশুরা ও আইয়ামে বিজের রোজা রাখতেন। রমজানের রোজা প্রথম ফরজ হলে তা রাখা ও না রাখার ব্যাপারে বান্দার ইচ্ছাধিকার ছিল। কেউ স্বেচ্ছায় রোজা না রেখেও ফিদিয়া দিতে পারত। অতঃপর ধীরে ধীরে রোজায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেই শিথিলতা তুলে নেওয়া হয়।

রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে ইসলামের শুরুর যুগে আশুরার রোজা ওয়াজিব ছিল। অতঃপর রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজার ওয়াজিব বাতিল হয়ে তা মুস্তাহাব হয়ে যায়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রমাজানের রোজা ফরজ করা হলে আশুরার রোজা ছেড়ে দেওয়া হয়। যার ইচ্ছা সে পালন করবে আর যার ইচ্ছা পালন করবে না। (সহিহ বুখারি)

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক