‘১০ মার্চের মধ্যে সব শিক্ষার্থীর হাতে বই’

প্রাথমিকভাবে মুদ্রণ ও বিতরণে দেরি হলেও আগামী ১০ মার্চের মধ্যে সব শিক্ষার্থী তাদের পাঠ্যবই হাতে পাবে বলে আশ্বস্ত করেছেন বিদায়ী শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘নতুন বই ফেব্রুয়ারির মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও, অনেক শিক্ষার্থী এখনও অপেক্ষায় রয়েছে।’

তিনি আশ্বস্ত করেন যে নতুন সময়সীমার মধ্যে এই সমস্যা সমাধান করা হবে।

সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক অস্থিরতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেছে বলা যাবে না, তবে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে।’

ওয়াহিদউদ্দিন শিক্ষা খাতে আর্থিক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে বলেন, এক বছরের বাজেটে ১৫ বছরের বঞ্চনা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ‘এই বছরের বাজেটের মধ্যে পেনশন এবং কল্যাণভাতার জন্য সব তহবিল বরাদ্দ করা সম্ভব নয়। তবে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং অন্যান্য সুবিধাও অন্তর্ভুক্ত করা হবে, ’ বলেন তিনি।

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাড়তি ভাতা : আগামী ঈদুল আজহা থেকে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাড়তি ভাতা পাবেন বলে আশা পোষণ করেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

তিনি বলেন, ‘তাদের উৎসব ভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা এ বছরের ঈদুল আজহা থেকে শুরু করে আমরা আগামী বছরের বাজেট থেকে অন্তত কিছু বাড়াতে পারব। এখানেও আমি ঘোষণা দিচ্ছি না কত বাড়াব। কিন্তু আমি জানি, কারণ সেটুকু বাজেটের মধ্যে, এ বছরের এবং আগামী বছরের বাজেটের মধ্যে সেটার পজিশন রাখা হচ্ছে।’

অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষকদের অবসর ভাতা ও কল্যাণভাতার জন্য একটা ফান্ড এ বছরই কিছুটা তৈরি করা হয়েছে। আগামী বাজেটে আরও রাখা হবে। কিন্তু এ সম্পূর্ণ ফান্ডটাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টেকসই করতে হলে এক-দুইটা বাজেটে হবে না তিন চার বাজেটে; আশা করি, ভবিষ্যতে এটা সমাধান হয়ে যাবে।’

কেন্দ্রীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ হওয়ায় কম বেতন পাওয়া শিক্ষকদের দুর্ভোগে পড়তে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছি সেটা হলো বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা ও স্কুলশিক্ষকদের অনলাইনভিত্তিক বদলির একটা প্রক্রিয়া আমরা ঘোষণা করেছি।’

শিক্ষা উপদেষ্টা যখন ভাতা বাড়ানোর বার্তা দিলেন তখন রোজার ঈদ থেকেই শতভাগ উৎসব ভাতা, এমপিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয়করণ, সরকারি কর্মচারীদের মতো একই হারে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার দাবিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্রসঙ্গত গতকাল সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর নবনিযুক্ত শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার দায়িত্ব নিয়েছেন।

বেসরকারি শিক্ষকদের সুখবর দিয়ে বিদায় নিলেন ওয়াহিদউদ্দিন : দায়িত্ব ছাড়ার দিনে এমপিওভুক্ত (সরকারি বেতনের তালিকাভুক্ত) বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সুখবর দিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি জানিয়েছেন, শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসবভাতা, বাড়িভাড়া, চিকিৎসাভাতা ও বিনোদনভাতা বাড়ানো হচ্ছে। আগামী ঈদুল আজহা থেকে এ সুবিধা কার্যকর হবে।

এতদিন শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। গতকাল বুধবার শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও মানবাধিকারকর্মী চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার)। ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এখন শুধু পরিকল্পনা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করবেন।

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, ‘এ বছরের ঈদুল আজহায় আগামী বছরের বাজেট থেকে অন্তত কিছু বাড়াতে পারব। এখানে আমি ঘোষণা দিচ্ছি না কত বাড়াব। তবে এটুকু বলতে পারি, এ বছর বাজেটের মধ্যে যতটুকু করা সম্ভব তা করা হবে এবং আগামী বছরের বাজেটের মধ্যে এটির বিধান রাখা হবে।’

বুধবার সকাল ১১টার দিকে বঙ্গভবনে সি আর আবরারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যান সি আর আবরার। সে সময় সদ্য সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ উপস্থিত ছিলেন। দুজনকেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানেই শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

বেসরকারি শিক্ষকদের বিষয়ে বলতে গিয়ে অধ্যাপক মাহমুদ বলেন, ‘১৫-২০ বছরের বঞ্চনা ১-২ বছরের বাজেট দিয়ে মেটানো যায় না। এটা বোঝানো খুব কঠিন। আজই সরকারি বেতনের সমান করে দিতে হবে এটা ন্যায্য দাবি বুঝলাম; কিন্তু এক বছরের বাজেট দিয়ে কী করে ১৫ বছরের বৈষম্য ঠিক করা যায়? তবে শুরুটা করা দরকার। শুরুটা আমরা করে দিয়ে যাচ্ছি।’

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণভাতার জন্য একটি তহবিলের কিছুটা এ বছরই তৈরি করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ বছরই কিছুটা তৈরি করা হয়েছে। আগামী বাজেটে আরও রাখা হবে। তবে পুরো তহবিলটিকে টেকসই করতে হলে ১-২ বাজেটে হবে না, ৩-৪ বাজেট লাগবে; আশা করি, ভবিষ্যতে এটির সমাধান হয়ে যাবে।’

নতুন শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার শরণার্থী ও শ্রমঅভিবাসন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। তার জন্ম ১৯৫২ সালের ১৭ আগস্ট ফরিদপুরে। মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেন। এরপর যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে এমএ এবং অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের খ্যাতিমান এ অধ্যাপক শরণার্থী ও অভিবাসন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা সমন্বয়ক। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করছেন তিনি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে দায়িত্ব নিয়ে অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার) বলেন, ‘আমি এমন শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখি, যেখানে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা দেশের ভেতরেই তাদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাবে এবং বাংলাদেশ থেকেই বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে।’

তিনি বলেন, ‘আমি জীবনে কোনোদিন এ ধরনের পরিসরে এসে বসব, এটা কখনোই ভাবিনি। বিভিন্ন সময় আইন ও নীতি পরিবর্তন করার বিষয়ে মন্ত্রী-সচিবদের সঙ্গে বসেছি। আমি শিক্ষকতার পাশাপাশি শ্রম অভিবাসন, শরণার্থী, বাস্তুচ্যুত মানুষ, ক্যাম্পে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী এসব বিষয়ে সক্রিয় নাগরিক হিসেবে কাজ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি, নিয়মকানুন মেনে, নৈতিকতা মেনে কাজ করেছি। জ্ঞাতসারে ক্লাস মিস করিনি। পরীক্ষার খাতা মোটামুটি সময়মতো জমা দিয়েছি। শিক্ষক হিসেবে যেসব প্রশাসনিক দায়িত্ব এসেছে সেগুলো পালনের চেষ্টা করেছি। আমি মনে করেছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে যে সুযোগ-সুবিধা আমি সবসময় সে বিষয়ে সচেতন থাকার চেষ্টা করেছি। সমাজ আমাকে দিয়েছে, এখন আমার সময় এসেছে যতটুকু সম্ভব সমাজকে দেওয়ার।’

নতুন শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘এ ধরনের দায়িত্ব যে আমাকে নিতে হবে সেটা আমি বুঝিনি। চার-পাঁচ দিন আগে প্রধান উপদেষ্টা আমাকে ডেকে পাঠালেন, অন্য অনেক কথার পর উনি যখন বললেন, স্যার (ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ) এ দায়িত্ব আর পালন করতে চাচ্ছেন না। প্রধান উপদেষ্টা বললেন, আমি যেন এ দায়িত্বটা গ্রহণ করি। এতে আমি অবাক হয়েছি। আমি বললাম, আমার তো এ ধরনের অভিজ্ঞতা নেই। তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) বললেন, ইউ কমিট ইয়োরসেলফ, তাহলে তুমি এটা পারবে। আমরা বিভিন্ন ধরনের নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। বড় ধরনের একটা পরিবর্তন হয়েছে। আমরা কিন্তু কখনোই ভাবিনি, আমাদের জীবদ্দশায় মুক্তভাবে কথা বলতে পারব।’

সি আর আবরার বলেন, ‘আমরা মনে করি অনেক কিছু করার আছে। ৮-১০ মাসের মধ্যে এ সরকারের মেয়াদকালে বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা স্বল্পমেয়াদি বিষয়গুলোকে চিহ্নিত করব। সেগুলোর ব্যাপারে কাজ শুরু করব। দীর্ঘমেয়াদি যে ইস্যুগুলো আছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে বলে আমরা যদি মনে করি, তবে অংশীজনদের সঙ্গে সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করব। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে যত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, আশা করি আমরা একই সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারব। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা হচ্ছে জনগণের বড় রকমের অধিকার। এসব ভিত্তি খাতের বিষয়ে যে দায়িত্ব আমাদের ওপর অর্পিত হয়েছে, আশা করি সেই দায়িত্ব আমরা যৌথভাবে পালন করতে পারব। আমরা সহযাত্রী হিসেবে কাজ করব।’