দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপের নিরাপত্তার বিষয়টি বড় আকারে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে বিভিন্ন কারণে সেই প্রেক্ষাপট এখন বদলেছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তনের পর ইউরোপের ২৭টি দেশের জোট ইইউর কপালের ভাঁজ বেড়েছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে এক বিশেষ প্রতিরক্ষা সম্মেলনে মিলিত হন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা। ইইউ নেতাদের বৈঠকে ‘রিআর্ম ইউরোপ’ শিরোনামে ৮০ হাজার কোটি ইউরোর একটি পরিকল্পনা পেশ করেন ইউরোপীয় কমিশনের চেয়ারম্যান উরসুলা ফন ডার লিয়েন। সেই সঙ্গে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপ এখন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে ইইউর সামনে নিজেদের সুরক্ষা বাড়িয়ে সামরিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। এ বিষয়টিকে সামনে রেখে উরসুলা মন্তব্য করেন, এটা ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, আমাদের প্রত্যাশা আমাদেরই পূরণ করতে হবে।
উরসুলা ইউরোপের নেতাদের চিঠি দিয়ে বলেছেন, পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক খারাপ। আমাদের জীবনকালে এ রকম বিপদ আগে আসেনি। প্রবল ঝুঁকির মুখে পড়েছে স্বাধীন ও সার্বভৌম ইউক্রেন এবং ইউরোপের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধি। উরসুলার আশা, তার এই পরিকল্পনা ইউরোপের দেশগুলোর প্রতিরক্ষা বাজেটের চরিত্র বদলাবে। অতীতে বিভিন্ন দেশের সরকার আর্থিক অসুবিধার কারণ দেখিয়ে বাজেট বরাদ্দ কম রাখত। ইউরোপের দেশগুলোতে জিডিপির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সেই সীমা বাড়াবার কথা বলা হয়েছে উরসুলার প্রস্তাবে। এর ফলে আগামী চার বছরে সামরিক খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৫০ কোটি টাকা বেড়ে যাবে। ইইউর বাজেটে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে ইইউর কিছু দেশের আপত্তি আছে। এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই অর্থ দিয়ে মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম, ড্রোন, সাইবার প্রস্তুতি বাড়ানো হবে। আরেক প্রবীণ ইইউ কর্মকর্তা বলেছেন, নেতারা দ্রুত এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন চান। তাহলেই ইইউর পক্ষে নিজেদের জন্য সুরক্ষা জোরদার করা সম্ভব হবে।
কয়েক দিন আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ডাকা বৈঠকে এবং গত রবিবার যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের ডাকা বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন ইউরোপের দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা। সেই সঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থন ও সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে ইউক্রেনকে সাহায্য করা নিয়ে জোটের এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছে হাঙ্গেরি ও সেøাভাকিয়া। সেøাভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো বলেন, তার দেশ এই পরিকল্পনা আটকাবে না। কিন্তু তারা কোনো অর্থও দিতে পারবে না।
এই পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিধা ছিল সুইডেনেরও। তবে সুইডিশ ডিফেন্স রিসার্চ এজেন্সির গবেষক ক্যালে হ্যাকানসন বলেছেন, কয়েক দিন ধরে সুইডেনের মনোভাবে একটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ট্রাম্প ও ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার পর তাদের মনোভাবে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টেরসনের বরাত দিয়ে হ্যাকানসন জানান, সুইডেন উরসুলার পরিকল্পনা সমর্থন করে। ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও জার্মানিরও দ্বিধা ছিল, কিন্তু তারা তাদের অবস্থান বদল করেছে। উরসুলা এই পরিকল্পনার কথা জানানোর কয়েক ঘণ্টা আগে সিডিইউ নেতা ফ্রিডরিখ মেৎর্স জানিয়েছেন, তারা প্রতিরক্ষা ও পরিকাঠামো খাতে ৫ হাজার কোটি ইউরো করে বেশি বিনিয়োগ করবেন।
এদিকে ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ বুধবার জানান, ইউক্রেনের সঙ্গে সব ধরনের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করে দিয়েছে ওয়াশিংটন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর সর্বাত্মক হামলা শুরুর প্রাথমিক পর্যায় থেকেই কিয়েভের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সম্প্রতি ট্রাম্প-জেলেনস্কির মধ্যে বাগবিত-ার জেরে দুই দেশের সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে অবনতি হয়েছে। তারপর থেকে ইউরোপের নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগ আরও বেশি বেড়ে গেছে। চলমান পরিস্থিতিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট মাখোঁ বলেছেন, ইউরোপ এখন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্স তার পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের সুরক্ষার ব্যাপারে ইউরোপের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। ইউরোপীয় জোটটির আশঙ্কা, এই যুদ্ধে রাশিয়া দায়মুক্তি পেলে ভবিষ্যতে ইইউভুক্ত দেশ তাদের হামলার শিকার হতে পারে। পাশাপাশি, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহায়তার ওপর আর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারছেন না।