ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

মুন্সীগঞ্জের অবৈধ অস্ত্র গেল কোথায়

সময়টা ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। কোটাবিরোধী আন্দোলনে সরকার পতনের ঢেউ। ঘড়ির কাটায় সকাল সাড়ে ৯টা। মুন্সীগঞ্জ শহরের থানারপুল থেকে কৃষি ব্যাংক মোড় ও থানারপুল থেকে মানিকপুর সড়কে নামে ছাত্র-জনতার ঢল। স্বৈরাচার সরকার হটাতে তাদের কণ্ঠে নানা স্লোগান।

অন্যদিকে থানারপুল এলাকার একটি মার্কেটের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়ান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে শামিল হন সাধারণ মানুষও। ঠিক সে সময় মানববন্ধনকারী শিক্ষার্থীদের মারধর করে তাড়িয়ে দেয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। খবরে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে কৃষি ব্যাংক মোড় ও মানিকপুর সড়কে অবস্থান নেওয়া সরকার পতনের আন্দোলনকারীরা। সামনের দিকে এগোতেই তাদের ওপর টিয়ার শেল ও গুলি ছোড়ে পুলিশ। 

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুলিশের সঙ্গে সেখানে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছাত্র-জনতার ওপর হামলে পড়ে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা। ছাত্র-জনতার ওপর চলে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। হেলমেট পরে অবৈধ অস্ত্র হাতে ছাত্রলীগ-যুবলীগের গুলিবর্ষণে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোটা শহর। ক্ষমতাসীনদের অবৈধ অস্ত্রের দাপটের কাছে ছাত্র-জনতা বুক পেতে নেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে আসে অসংখ্য গুলিবিদ্ধ ও কয়েকজন নিহতের খবর।

এদিন বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে দফায় দফায় ছাত্র-জনতা ও আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ। দিনভর এ সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। এরা হচ্ছেন শহরের উত্তর ইসলামপুর এলাকার দিনমজুর সজল মোল্লা (৩০), রিয়াজুল ফরাজী (৩৮) ও নুর মোহাম্মদ ডিপজল (১৯)। এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্ট্রার অনুযায়ী গুলিবিদ্ধ ৯৫ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন শতাধিক। 

এদিকে ৪ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহার করা অবৈধ অস্ত্র সাত মাসেও উদ্ধার হয়নি। ধরা পড়েনি অস্ত্রধারীরা। এখন প্রশ্ন উঠেছে, ছাত্রলীগ-যুবলীগের সেই অবৈধ অস্ত্র গেল কোথায়। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর লাপাত্তা সেসব অস্ত্রধারীরা। আবার অস্ত্রধারীদের কেউ কেউ বিদেশে পালিয়েছেন। আবার কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন দেশের ভেতর। কাজেই ছাত্র-জনতার ওপর ব্যবহার করা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে। পুলিশ ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে অস্ত্রধারীদের চিহ্নিত করতে মাঠে নেমেছে। করা হচ্ছে তালিকাও। তাছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে আসা বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৪ আগস্ট শহরের থানারপুল ও কৃষি ব্যাংক মোড়ে পুুলিশের উপস্থিতিতেই হেলমেট পরিহিত অবস্থায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীদের ছাত্র-জনতার ওপর অবৈধ অস্ত্রে গুলিবর্ষণ করার চিত্র ফুটে উঠেছে। 

এ ছাড়া গত ১৯ জুলাই শহরের উপকণ্ঠ পঞ্চসার ইউনিয়নের মিরেশ^রাই এলাকায় হেলমেট পরে অবৈধ অস্ত্র হাতে ছাত্রলীগ নেতার ভিডিও এবং ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্র-জনতার ওপর অবৈধ অস্ত্রের গুলিবর্ষণের ঘটনায় সর্বাগ্রে উঠে এসেছে শহর ছাত্রলীগের সভাপতি নসিবুল ইসলাম নোবেল এবং সাধারণ সম্পাদক ও মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেন সাগরের নাম। ৪ আগস্টের ভিডিও ফুটেজে গলায় গামছা ও মাথায় হেলমেট পরে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণসহ অবৈধ অস্ত্র হাতে সাজ্জাদ হোসেন সাগরকে দিনভর দেখা গেছে থানারপুল ও কৃষি ব্যাংক মোড়ে। সেদিন সেখানে তাকে ছাড়াও হেলমেট পরে আরও বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীকে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। এর আগে ১৯ জুলাই শহরের উপকণ্ঠ মিরেশ^রাই এলাকার সড়কে ছাত্র-জনতা ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভ করতে গেলে সেখানে হেলমেট পরে অবৈধ অস্ত্র হাতে দেখা যায় শহর ছাত্রলীগের সভাপতি নসিবুল ইসলাম নোবেলকে। ওই সময় তিনি ছাত্র-জনতা ও সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। 

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সরকার পতনের পর দেশ ছেড়ে এখন নেদারল্যান্ডসে স্ত্রীর সঙ্গে অবস্থান করছেন শহরের সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি অস্ত্রধারী নিবির আহমেদ। আরেক অস্ত্রধারী সদর উপজেলার চরকেওয়ার ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাহাত আহমেদ শাকিল চলে গেছেন মধ্যপ্রাচ্যের কাতারে। হেলমেট পরে গুলিবর্ষণ করা শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর কাউন্সিলর প্রথমে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। সেখান থেকে বর্তমানে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তবে শহর ছাত্রলীগের সভাপতি অস্ত্রধারী নসিবুল ইসলাম নোবেল দেশেই আছেন, নাকি বিদেশে পালিয়েছেন তা কেউ বলতে পারছেন না। এমন করেই অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা দেশে-বিদেশে আত্মগোপনে ও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। 

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীদের পলায়ন হলেও তাদের ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র গেল কোথায় এমন প্রশ্ন করেছেন জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মু. মাসুদ রানা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশের সঙ্গে এক কাতারে থেকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ হেলমেট পরে গুলিবর্ষণ করেছে। তাদের গুলিতে তিনজন নিহত ও শতাধিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ছাত্রলীগ-যুবলীগ আত্মগোপনে কিংবা পালিয়ে গেলেও অবৈধ সেই অস্ত্র উদ্ধার করা দরকার। 

গণঅভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ শহরের উত্তর ইসলামপুরের মঞ্জিল মোল্লা (৪৮) জানান, ৪ আগস্ট সকালে ছাত্রদের ওপর একের পর এক হামলা করে ধাওয়া দেওয়ার খবর কানে আসে তার। এতে তিনি ছাত্রদের সঙ্গে আন্দোলনে শামিল হতে ছুটে যান পিটিআইসংলগ্ন কৃষি ব্যাংক মোড়ে। এ সময় আকস্মিক তার পেটে দুটি গুলি লাগে। তিনি বলেন, সেদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা নির্বিচারে আমাদের ওপর গুলি ছুড়েছিল। অসংখ্য মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়। আমার এলাকার তিন ভাই গুলি খেয়ে মারা যায়। তিনি আরও বলেন, সেদিন যেসব অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। স্বৈরাচার সরকার পতনের পর সেই অবৈধ অস্ত্র এখন কোথায়। তা খুঁজে খুঁজে উদ্ধার করা দরকার। একই সঙ্গে অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার দেশ রূপান্তরকে জানান, ৪ আগস্টের ঘটনার বেশ কিছু ভিডিও ফুটেজ তাদের হাতে এসেছে। সেসব ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। চিহ্নিত করা হচ্ছে অস্ত্রধারীদের। তিনি বলেন, অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমানে অপারেশন ডেভিল হান্ট চলছে। কাজেই শিগগিরই ধরা পড়বে অস্ত্রধারীরা। উদ্ধার করা হবে অবৈধ অস্ত্র। পুলিশ সুপার দাবি করেন, ইতিমধ্যে ৪ ও ৫ আগস্টের ঘটনায় বেশ কয়েকটি অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।