হাসিনা ও তার পরিবারের সব সম্পদ জব্দের আদেশ

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানার নামে থাকা সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক এবং তাদের ১২৪টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারির আদেশ দেয় আদালত।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক পৃথক আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর সিনিয়র জজ আদালত থেকে আদেশ দেওয়া হয়। দুদক মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন গতকাল মঙ্গলবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।

দুদক মহাপরিচালক জানান, শেখ হাসিনার সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদের নামে থাকা ধানমন্ডি ৫ নম্বর রোডের ১৬ কাঠা আয়তনের ৫৪ নম্বর সুধাসদন নামীয় বাড়ি ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের গুলশানের ৭১ নম্বর রোডের ১১ নম্বর ইস্টার্ন হারমনি ভবনের ২৪৩৬ বর্গফুট আয়তনের বি/২০১ নম্বর ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দিয়েছে আদালত।

তিনি আরও জানান, শেখ রেহানার নামে থাকা রাজধানী সেগুনবাগিচার ৭৯ নম্বর হোল্ডিংয়ের ২০৬ নম্বর ফ্ল্যাট, গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর থানার মৌচাক ইউনিয়ন পরিষদের সফিপুর এলাকার ৮ দশশিক ৫ শতাংশ জমি, একই এলাকায় ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ জমি ক্রোক করার আদেশ দিয়েছেন।

দুদক মহাপরিচালক জানান, শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিকের নামে থাকা নিকেতন এলাকার সাততলা বাড়ির চারতলায় কারপার্কিংসহ ১৯২০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং একই আয়তনের তৃতীয়তলার একটি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দিয়েছে আদালত। একই এলাকার অপর একটি ভবনের কারপার্কিংসহ দ্বিতীয়তলা, পঞ্চমতলা ষষ্ঠতলা এবং সপ্তমতলা ১৮০০ বর্গফুট করে চারটি ফ্ল্যাট ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া তার গাজীপুরের সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের ১২৪ ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ : ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। সেই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংস্থাটির উপপরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম তাদের ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ চেয়ে আদালতে আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, অভিযোগসংশ্লিষ্টরা অস্থাবর সম্পদ অন্যত্র হস্তান্তর, স্থানান্তর বা বেহাত করার চেষ্টা করছেন। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে এসব ব্যাংক হিসাব অবিলম্বে অবরুদ্ধ করা আবশ্যক। সেই আবেদনের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত ১২৪ টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেয়।

যেসব ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আদেশ দেওয়া তারা হলেন, শেখ হাসিনা, ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানাসহ আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট, সেন্ট্রাল ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই), সূচনা ফাউন্ডেশন, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরসহ শেখ পরিবারের নামে থাকা ব্যাংক হিসাব। এসব ব্যাংক হিসাবে কোনো লেনদেন করা যাবে না।

সপরিবারে শেখ হাসিনার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তার পরিবারের সদস্যরাও বিদেশে অবস্থান করছেন। শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের নামে বিপুল অর্থ লোপাটসহ বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। এ কারণে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদন করেন দুদকের উপপরিচালক মনিরুল ইসলাম। দুদকের আবেদনের  প্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. জাকির হোসেন গালিবের আদালত তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আদেশ দেয়।

নিষেধাজ্ঞা পাওয়া অন্যরা হলেন, শেখ হাসিনার ছেলে সজিব আহমেদ ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, ছোটবোন শেখ রেহানা, শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক, আজমিনা সিদ্দিক ও রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক।

আবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের নামে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ দুদকে অনুসন্ধানাধীন। অভিযোগটি অনুসন্ধানপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। অনুসন্ধান চলার সময় বিশ্বস্ত সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় যে, অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সপরিবারে গোপনে দেশত্যাগ করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা দেশত্যাগ করে বিদেশে পালিয়ে গেলে অভিযোগসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র প্রাপ্তিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। তাছাড়া সার্বিক অনুসন্ধানকাজে বিঘœ সৃষ্টিসহ সমূহ ক্ষতির কারণ রয়েছে। সেজন্য অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধান কার্যক্রমের স্বার্থে তাদের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা একান্ত প্রয়োজন।

জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা সবাই রয়েছেন বিদেশে। সেক্ষেত্রে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, তাদের বিদেশে অবস্থানের বিষয়টি আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে জানে না। তাই আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানার ক্ষেত্র তৈরি করতে এই আবেদন করা হয়। তাছাড়া তাদের গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলসহ অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা চাইতে গেলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি থাকতে হয়। এ কারণে নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করা হয়।