বাংলাদেশে সফররত জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জাতীয় ঐকমত্য ও রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠক করেছেন। বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সংস্কার, সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গতকাল শনিবার এ বৈঠকে সাতটি রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। একাধিক উপদেষ্টার পাশাপাশি ছিলেন সংস্কার কমিশনপ্রধানরাও।
বৈঠক শেষে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সংস্কার অবশ্যই করতে হবে, তবে তা দ্রুত শেষ করে নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সংসদে বাকি বিষয়গুলোর সমাধান সম্ভব।’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমরা সুষ্ঠু নির্বাচন ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে আলোচনা করেছি। জাতিসংঘ মহাসচিবও স্বচ্ছ নির্বাচনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বর্তমান সরকারের মেয়াদেই মূল ভিত্তি তৈরির ওপর জোর দিয়েছি। গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছি।’ বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহের, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকি, সিপিবির রুহিন হোসেন প্রিন্স ও এবি পার্টির আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
নাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘জনগণের কাছে আমাদের সংস্কারের যে কমিটমেন্ট, সংস্কারের যে ধারাবাহিকতা, সেটা বাস্তবায়নের জন্য জুলাই সনদের দ্রুত বাস্তবায়নের কথা বলেছি।’
তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের গণতন্ত্র যে একটি সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে সেটাই আলোকপাত করা হয়েছে। সংস্কার কমিশনের প্রধানরা তাদের স্ব স্ব সংস্কার রিপোর্টের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেছিলেন। রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা তাদের দলীয় অবস্থান সংস্কার বিষয়ে তুলে ধরেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির পক্ষে আমাদের সংস্কার বিষয়ে যে অবস্থান, আমরা মনে করি, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যে সরকার গঠিত হয়েছে, বিচার ও সংস্কার জনগণের কাছে তাদের অন্যতম কমিটমেন্ট।’
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে কোনো আলোচনা করেছেন কি না, জানতে চাইলে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এখানে বিস্তারিত আলাপের সুযোগ ছিল না। আমরা সংস্কার বিষয়ে ওভারঅল আলোচনা করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘গণপরিষদের মাধ্যমেই সংস্কার করতে হবে, অন্যথায় সংসদের সংবিধান সংস্কার টেকসই হবে না; বাংলাদেশের ইতিহাস থেকেও এটাই দেখতে পাই। সেই জায়গা থেকে আমরা গণপরিষদ নির্বাচন চাচ্ছি। সামনের যে জাতীয় নির্বাচন সেটা একই সঙ্গে আইনপরিষদ ও গণপরিষদ নির্বাচন হোক। পাশাপাশি আমরা বিচারের বিষয়টা বলেছি।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নাহিদ বলেন, ‘আমরা আমাদের এই দলীয় অবস্থান সংক্ষেপে বলেছি। জাতিসংঘ মহাসচিবও তার জায়গা থেকে বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ও সরকার, তারা যেন নিজেরাই সমঝোতায় আসে। একটা ঐকমত্যে আসে। গণতন্ত্রের ট্রু এসেন্স, সেটাকে মাথায় রেখেই যেন আমরা একসঙ্গে কাজ করি, একটি ঐকমত্যে আসতে পারি, সেটাই তিনি তার জায়গা থেকে বলেছেন।’
নির্বাচন সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি এবং আমরা এটাই বলেছি যে, নির্বাচন কিন্তু আমরা সংস্কারের একটা প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি, সংস্কারের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখি। কোনো রকম সংস্কার ছাড়া বা সংস্কারবিহীন নির্বাচন কোনো কাজে দেবে না।’
তারা ভাষায় ‘অন্য সব রাজনৈতিক দলও এটার সঙ্গে একমত পোষণ করে। এখানে মতপার্থক্যগুলো হচ্ছে, কোন সংস্কার কখন হবে, নির্বাচনের আগে কতটুকু হবে, নির্বাচনের পরে কতটুকু হবে এটা নিয়ে। সেটা আমরা মনে করি যে, জুলাই সনদের মধ্যে সেটা বাস্তবায়ন হলে মতপার্থক্যগুলো কেটে যাবে এবং আমরা একটা ঐকমত্যে আসতে পারব।’
বিএনপি, জামায়াত, নাগরিক ঐক্য, সিপিবি, এবি পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, এনসিপি এই সাতটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠক করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। গোলটেবিল বৈঠকে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারবিষয়ক কমিশনের প্রধান ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, পুলিশ সংস্কার কমিশনের প্রধান সফর রাজ হোসেন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মুনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন। জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইস, ইউএনএইটসিআরের আবাসিক প্রতিনিধি সুম্বুল রিজভী, আইএলওর কান্ট্রি ডিরেক্টর টুমো পুটিআইনেন, ডব্লিউএফপির আবাসিক প্রতিনিধি ডমিনিকো স্কেলপেনি, ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার, ডব্লিউএইচওর আবাসিক প্রতিনিধি বর্ধন জং রানা, ইউএনওপিএসের আবাসিক প্রতিনিধি সুধীর মুরলীধরন, আইওএমের মিশনপ্রধান ল্যানস বনেউ, ইউনেস্কোর প্রধান নির্বাহী পরিচালক ও ইউনিসেফের আবাসিক প্রতিনিধি গোলটেবিলে উপস্থিত ছিলেন।
চার দিনের সরকারি সফরে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা আসেন জাতিসংঘের মহাসচিব। শুক্রবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতার করেন তিনি।