অধিকাংশ ফলদার গাছই মৌসুমভিত্তিক ফল দেয়। মৌসুমি ফলের স্বাদ ও মূল্য দুটোই ক্রেতার অনুকূলে থাকে। তেমনি রমজান হলো ইবাদতের বসন্ত ঋতু। তাই এর সওয়াবও অন্য মাসের ইবাদতের চেয়ে বেশি। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘প্রতিটি নেক কাজের প্রতিদান দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়, কিন্তু রোজা আমারই জন্য রাখা হয় এবং স্বয়ং আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (তিরমিজি)
মুমিনের জীবনে পরম প্রাপ্তি হলো মহান আল্লাহর দিদার বা সাক্ষাৎ লাভ। আর রোজার মাধ্যমে সেটি পাওয়ার ওয়াদা করা হয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দঘন মুহূর্ত রয়েছে। একটি হলো ইফতারের সময়। (এ সময় যেকোনো নেক দোয়া কবুল করা হয়।) অন্যটি হলো (কেয়ামতের দিবসে) স্বীয় প্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।’ (সহিহ বুখারি)
যদিও ব্যক্তিজীবন, সমাজ উন্নয়ন ও মানবতার সেবায় রোজার বহু উপকারিতা রয়েছে। তথাপি রোজার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া অর্থ বাঁচা, আত্মরক্ষা করা, নিষ্কৃতি লাভ করা, ভয় করা। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় ও তার সন্তুষ্টি লাভের আশায় অপরাধ, অন্যায় ও আল্লাহর অপছন্দনীয় কথা, কাজ ও চিন্তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার নাম তাকওয়া। একদা হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.)-কে হজরত ওমর (রা.) তাকওয়ার স্বরূপ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, ‘হে ওমর (রা.)! পাহাড়ের দুই ধারে কাঁটাবন, মাঝখানে সরু পথ। এমতাবস্থায় কীভাবে চলতে হবে? হজরত ওমর (রা.) বললেন, গায়ে যেন কাঁটা না লাগে, সাবধানে পথ চলতে হবে। হজরত কাব (রা.) বললেন, এটাই তাকওয়া।’
কেউ কেউ বলেন, তাকওয়া হলো অন্তরের জ্যোতি বা উজ্জ্বলতার নাম, যার মাধ্যমে বান্দা সঠিক পথ ও কর্মপন্থা বেছে নিতে পারে। তাকওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে পবিত্র কোরআনে প্রায় আড়াই শতাধিক আয়াত আনা হয়েছে। কেবল সুরা বাকারাতেই প্রায় ত্রিশবার তাকওয়া শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত তাকওয়াই হলো ইবাদতের প্রাণশক্তি। এ জন্য পবিত্র কোরআনে প্রায় প্রতিটি বিধিবিধানের পরই তাকওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এমনকি তাকওয়াবিবর্জিত ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিঃসন্দেহে আল্লাহ মুত্তাকিদের আমলই কবুল করেন।’ (সুরা মায়েদা ২৭) অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর কাছে (তোমাদের কোরবানির) গোশত বা রক্ত কোনোটিই পৌঁছে না। কিন্তু তার কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া পৌঁছে।’ (সুরা হজ ৩৭)
তাকওয়া হচ্ছে জান্নাত লাভের অপরিহার্য শর্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সে জান্নাতের উত্তরাধিকারী আমি অবশ্য তাদের বানাব, আমার বান্দাদের মধ্যে যারা তাকওয়ার অধিকারী।’ (সুরা মারইয়াম ৬৩) তাকওয়ার মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর কাছে মর্যাদার আসনে সমাসীন হয়। আল্লাহর কাছে সাদা-কালো, ধনী-দরিদ্র, আরব-অনারব, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের ভিত্তিতে কারও মূল্যায়ন হবে না, বরং মূল্যায়নের ভিত্তি হবে তাকওয়া। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়া অর্জনকারী।’ (সুরা হুজরাত ১৩)
তাকওয়ার অর্থ দিয়েই বোঝা যায়, এখানে বেঁচে থাকার কথা বলা হয়েছে। আমরা জানি, বেঁচে থাকতে হয় বিপজ্জনক, প্রতিকূল ও বেগতিক অবস্থা থেকে। সুতরাং আজকের এই পাপ-পঙ্কিলতাপূর্ণ পৃথিবী, যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অশ্লীলতা, পাপাচার, অনাচার, শিরক, কুফর ও বিদআত অক্টোপাসের মতো লেগে আছে, দুর্নীতি, সুদ আর ঘুষের যেখানে মহোৎসব চলছে, সেখানে একজন মুমিনকে জীবনপথ পাড়ি দিতে হবে খুবই সাবধানে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। এককথায়, জীবন সফরের এ বিভীষিকাময় পথ পাড়ি দিতে হবে অতি সাবধানে, মধ্যপন্থা অবলম্বন করে।
লেখক : প্রিন্সিপাল, পদুয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, ফেনী