রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের সমন্বয়ে গঠিত হতে যাওয়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম চূড়ান্ত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) সাত কলেজের ৩২ সদস্যবিশিষ্ট শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইউজিসির এক সভায় সমন্বিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে নাম ঠিক হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো কেমন হবে বা কবে নাগাদ এর কার্যক্রম পরিচালনা শুরু হবে, তা নিয়ে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ফলে প্রাথমিকভাবে সাত কলেজের সংকটের সমাধান হয়েছে বললেও এখনো তা সম্পূর্ণ সমাধান হয়েছে বলা যাবে না। চলতি বছরে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় পড়লেও সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধীনেই আরও বেশ কয়েক বছর থাকা লাগতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ইউজিসির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সভায় সাত কলেজের নাম ঠিক হলেও এখনো প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে কোনো আলোচনা করা হয়নি। কবে নাগাদ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি তার কার্যক্রম শুরু করবে আর কবে নাগাদ শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হবে, তা নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি গতকালের সভায়। সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ সাল থেকেই ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ নামেই শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টেকনিক্যাল সমন্বয় করবে। যদিও ঢাবি প্রশাসনের দাবি, এ বিষয়ে ইউজিসির সঙ্গে বৈঠক শেষে নিশ্চিত করা যাবে।
তবে ২০৩০-৩১ সালের আগে ঢাবি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারবে না ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। এর কারণ, চলমান ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থীদের স্নাতকোত্তর শেষ করতে আরও কমপক্ষে চার-পাঁচ বছর লাগে। সে হিসাবে অন্তত ২০৩০ সাল নাগাদ তাদের ঢাবির অধিভুক্ত হয়েই থাকতে হবে। তাছাড়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি, সংসদে আইন পাসসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে দীর্ঘ সময় লাগবে বলেও জানা যায়। এ বিষয়ে ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের উপপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, সরকারি সাত কলেজের সমন্বয়ে গঠিত হতে যাওয়া নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম চূড়ান্ত হলেও ২০৩১ সাল পর্যন্ত ঢাবির অধীনেই থাকতে হচ্ছে। কবে থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাত্র তো নাম ঠিক হলো। এখন আইন নিয়ে কাজ করতে হবে। এরপর সংসদে এ আইন পাস করে তবেই বিশ্ববিদ্যালয়। পুরো কার্যক্রম শুরু করতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সংকটের শুরু যেভাবে : শিক্ষার মানোন্নয়ন, সময়োপযোগী শিক্ষাপদ্ধতি প্রণয়নসহ নানা বিষয় সামনে রেখে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এর আগে কলেজগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল।
পরবর্তী সময়ে এসব কলেজ পরিচালনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ‘অনিয়ম ও অদূরদর্শিতা’র অভিযোগ, সেশনজট, পড়াশোনার মানোন্নয়ন না হওয়ায় গত বছর অক্টোবর থেকে অধিভুক্তি থেকে বের হয়ে আসার জন্য আন্দোলনে নামে কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা। ২০২৪ সালের ১৮ নভেম্বর তিতুমীর কলেজকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে মহাখালীর সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে গুটিকয়েক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ২৬ জানুয়ারি ভর্তি পরীক্ষায় অযৌক্তিক কোটা পদ্ধতি বাতিলসহ পাঁচ দফা দাবির অগ্রগতি জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুন আহমেদের সঙ্গে বাগবিত-ায় জড়ায় সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। এরপর ওই রাতেই সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবন ঘেরাও করতে গেলে ঢাবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় তারা। সেদিন রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব, নিউ মার্কেটসহ আশপাশের এলাকায় ঢাবির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাত কলেজের দফায় দফায় সংঘর্ষে আহত হয় অসংখ্য শিক্ষার্থী।
পরদিন ২৭ জানুয়ারি সাত কলেজের অধ্যক্ষদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের জরুরি বৈঠক শেষে অধিভুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয় ঢাবি । সেই সভায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাবির অধীন ভর্তি না নেওয়া, চলমান শিক্ষার্থীদের ঢাবির অধিভুক্ত রাখাসহ পাঁচটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওইদিন বৈঠকের পর ঢাবির উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা আলোচনার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের সম্মানজনক পৃথকীকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল আগামী বছর ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে সাত কলেজের ভর্তি কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করবে না। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেই সিদ্ধান্ত আমরা এক বছর এগিয়ে এনেছি। চলতি (২০২৪-২৫) শিক্ষাবর্ষ থেকে সাত কলেজের ভর্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়া হবে না।’ পরে ছয় কলেজ এই দাবি মেনে নিয়ে ইউজিসির সঙ্গে বৈঠক ও স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্বাস পেলে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে। একই সঙ্গে ৩ ফেব্রুয়ারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা সাত কলেজের আওতাধীন থাকার পক্ষে মত দিলে প্রাথমিকভাবে সেই সংকটেরও সমাধান হয়।
সমাধান কোন পথে : সাত কলেজের সংকট নিরসনে দীর্ঘ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে ডিসেম্বর মাসে ইউজিসি চেয়ারম্যানকে প্রধান করে গঠন করা হয় চার সদস্যবিশিষ্ট বিশেষ কমিটি। ওই কমিটির সদস্যরা তিন মাসের বেশি সময় ধরে সম্ভাব্যতা যাচাই, ক্যাম্পাস পরিদর্শন, সম্মানজনক পৃথকীকরণের রূপরেখা প্রণয়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকসহ বিভিন্ন কাজ করে সমন্বিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি নাম ঘোষণা করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাবি থেকে বের হওয়া এই সাত কলেজ দেখভালের দায়িত্বে কে থাকবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। প্রশ্ন ছিল এ কলেজগুলোকে কি আবারও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হবে? আর সেটা করা হলেও শিক্ষার্থীরা তা মানত না। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের দিকেই মনোযোগ দেয় বিশেষ কমিটি। ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, সাত কলেজের নাম ঠিক হয়েছে তবে এর সবকিছু সম্পন্ন করতে আরও সময় লাগবে। আইন পাস করতে হবে, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। এজন্য অন্তত বছর দুয়েক লেগে যাবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে যারা সাত কলেজে অধ্যয়নরত আছে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়েই থাকবে। তবে এ বছর (২৪-২৫ সেশন) থেকেই ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নামে শিক্ষার্থীদের ভর্তির বিষয়ে কাজ হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করবে। ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই তো সার্টিফিকেট দেওয়া হবে না সেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করতে কিছু সময় লাগলেও শিক্ষার্থীদের সমস্যায় পড়তে হবে না। সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, ২৭ জানুয়ারির সভায় ২০২৪-২৫ সেশন থেকেই সাত কলেজকে একীভূত না রাখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এখন পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। এ বিষয়ে খুব দ্রুত ইউজিসির সঙ্গে সভা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি বলেন, আমরা জানিয়েছি ২০২৩-২৪ সেশন পর্যন্ত সাত কলেজের যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি রয়েছে, তাদের শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন করতে ঢাবি প্রশাসন সার্বিক সহায়তা ও সহনশীলতা দেখাবে।