২০ জনের মৃত্যুদণ্ড ৫ জনের যাবজ্জীবন হাইকোর্টে বহাল

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ রাব্বীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ২০ জনের প্রানদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখে রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। গতকাল রবিবার বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ সংক্রান্ত রায় দেয়।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদন্ড অনুমোদন) অনুমোদন ও কারাগারে থাকা আসামিদের আপিল খারিজ করে এ রায় দেয় হাইকোর্ট। তিন বছরের বেশি সময় আগে তাদের মৃত্যুদন্ড ও যাবজ্জীবনের রায় দিয়েছিল বিচারিক আদালত। আসামিদের সবাই ছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মী।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হল থেকে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আবরারের বাবা রাজধানীর চকবাজার থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে ২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

যাদের প্রাণদন্ড দেওয়া হয়েছে তারা হলো, মো. অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মো. মনিরুজ্জামান মনির, মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, মো. মাজেদুর রহমান মাজেদ, মো. মুজাহিদুর রহমান, খন্দকার তাবাককারুল ইসলাম তানভীর, হোসাইন মোহাম্মদ তোহা, মো. শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম, মুনতাসির আল জেমি, মো. শামসুল আরেফিন রাফাত, মো. মিজানুর রহমান, এস এম মাহমুদ সেতু, মোর্শেদ-উজ-জামান মন্ডল জিসান, এহতেশামুল রাব্বি তানিম ও মুজতবা রাফিদ।

যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তরা হলেন, মুহতাসিম ফুয়াদ হোসেন, মো. আকাশ হোসেন, মুয়াজ আবু হুরায়রা, অমিত সাহা ও ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না। দ-প্রাপ্তরা সবাই  বুয়েটের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। পরে তাদের বহিস্কার করা হয়। মৃত্যুদ-  মুনতাসির আল জেমি ছাড়া বাকিরা কারাগারে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ৬ আগষ্ট জেমি গাজীপুরের হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের দেয়াল ভেঙে পালিয়ে যান বলে হাইকোর্টকে অবহিত করা হয়। গতকাল হাইকোর্টের এই বেঞ্চের কার্যতালিকায় মামলাটি রায়ের জন্য আসে। এর আগে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আসামিদের ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিলের ওপর শুনানি শেষে রায়ের জন্য মামলাটি অপেক্ষমান রাখে হাইকোর্ট।

প্রতিবাদী তারুণ্য ক্যাটাগরিতে এবার আবরার ফাহাদকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার  (মরণোত্তর) দেওয়া হচ্ছে।

‘ভবিষ্যতে আর যেন কোনো বাবা মায়ের বুক খালি না হয়’  : গতকাল রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, ‘আমরা সন্তুষ্ট। রায় যাতে অতিদ্রুত কার্যকর হয় সেটাই এখন আমাদের চাওয়া। ভবিষ্যতে  আর কোনো বাবা-মায়ের বুক যেন এভাবে খালি না হয়।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র‌্যাগিং আছে, সেটার পরিবর্তন চাই। ছাত্ররা যাতে ভালোভাবে বসবাস করতে পারে এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা যেন না  ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সবার কাছে আবেদন জানাই। বাবা-মা অনেক কষ্ট করে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার জন্য পাঠান। তারা যদি পড়ালেখা বাদ দিয়ে অন্য কিছুতে জড়ায় তাতে বাবা-মা কষ্ট পান। তাই শিক্ষার্থীদের এ ধরনের কর্মকান্ডে জড়ানো  উচিত নয়।’

আবরারকে মরনোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বরকত উল্লাহ বলেন, ‘তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃিত দিয়েছে এতে আমরা গর্বিত। এ জন্য সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’

যা বললেন আবরার ফাহাদের ভাই:  আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ বলেন,  ‘হাইকোর্ট থেকে এত দ্রুত একটি রায় আসবে, এটি আমরা এক বছর আগেও চিন্তা করিনি। এটা হয়তো পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো অনেকগুলো স্টেপ (বিচারের) বাকি আছে। সেগুলো যাতে দ্রুত সম্পন্ন হয় সেটা আমাদের চাওয়া থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘সাড়ে পাঁচ বছর হয়ে যাচ্ছে আমরা এটা নিয়ে আছি। আরও কতদিন লাগবে আমরা জানি না। এটি একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিণতি আর কারও না হয়। এজন্য আমাদের চাওয়া যত দ্রুত সম্ভব বাকি স্টেপগুলো সম্পন্ন হোক।’

আবরার হত্যার ঘটনার পর ছাত্র রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তণ আসছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ছাত্র রাজনীতিতে পরিবর্তন আসছে কি না, এটা যারা রাজনীতি করেন তারা বলতে পারবেন। আমরা সব সময় চাই, যে পরিণতি আবরার ফাহাদের হয়েছে, তা যাতে আর কোনো শিক্ষার্থীর না হয়।’

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি জেমির পালানো নিয়ে তিনি বলেন, ‘এমন একজন আসামি যিনি আবরার ফাহাদকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তার কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়াটা আমাদের জন্য হতাশার। কারণ, আমরা অপেক্ষায় আছি কবে এদের রায় কার্যকর হবে। তার মধ্যে আমরা জানতে পারছি, একজন পালিয়ে চলে গেছে। এটা কেন লুকিয়ে রাখা হলো, ছয় মাস পর কেন জানানো হলো এটার কোনো পরিষ্কার উত্তর আমরা পাইনি।’

এই রায় সমাজের জন্য একটি বার্তা: আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় রায়ের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘মাও সে তুংয়ের মতে, কোনো কোনো মৃত্যু হয়- পাহাড়ের মত ভারী, আর কোনো কোনো মৃত্যু পাখির পালকের মত হালকা। আবরারের মৃত্যু আমাদের কাছে পাহাড়ের মতো ভারী হয়ে আছে।’

তিনি বলেন, ‘আবরার হত্যা গোটা জাতির মূল্যবোধের শিকড়ে নাড়া দিয়েছে। আবরার ফাহাদের মৃত্যু এক্সপোজ করেছে যে, রাজনৈতিক ফ্যাসিজম কীভাবে দিনে দিনে বাড়তে পারে। একই সাথে তার মৃত্যু আমাদেরকে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছে যে, ফ্যাসিজম যত শক্তিশালী হোক, মানুষের মনুষ্যত্ববোধ কখনো কখনো জেগে উঠবে।’

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘এ রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে বার্তা গেল যে. আপনি যত শক্তিশালী হোন না কেন, আপনার পেছনে যত শক্তি থাকুক না কেন সত্য এবং ন্যায়বিচার একদিন প্রতিষ্ঠিত হবে।’

সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মায়ের : কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন মা রোকেয়া খাতুন। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে রায় কার্যকরের দাবি জানান। গতকাল দুপুরে হাইকোর্টের রায়ের পর কুষ্টিয়া শহরের নিজ বাসভবনে তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে দেশের মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন। কেউ আমাদের কাছ থেকে দূরে সরে যাননি। এ জন্য আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। এখন একটাই চাওয়া, রায় যেন দ্রুত সময়ের মধ্যে কার্যকর হয়। এ রায় কার্যকর হলে ভবিষ্যতে এমন কাজ করতে আর কেউ সাহস পাবে না। দেশের সকল উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে যেনো এমন প্রাণঘাতি রাজনীতি না থাকে সেই অনুরোধ করছি’।

যে কারণে ও যেভাবে পিটিয়ে হত্যা: বুয়েটের তড়িৎ কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন আবরার ফাহাদ। তিনি থাকতেন শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে। বাংলাদেশ ও ভারতের  মধ্যে কয়েকটি চুক্তি এবং পানি আগ্রাসন নিয়ে সমালোচনা করে তিনি তার ফেইসবুকে পোস্ট দেন। এ মামলার আসামিদের সবাই ছিলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের নেতা ও কর্মী। আসামিদের মধ্যে আটজন অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর সন্ধ্যার পর আবরার ফাহাদকে শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে শিবির সন্দেহে সেখানে ক্রিকেট স্টাম্প ও স্কিপিং রোপ দিয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে তাকে বেধড়ক পেটানো হয়, যা আসামিদের জবানবন্দিতেও উঠে আসে। আবরার ফাহাদকে কয়েক ঘণ্টা নির্যাতনের পর দোতলা ও নিচতলার সিঁড়ির মাঝামাঝি জায়গায় তাকে অচেতন অবস্থায় ফেলে যায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এরপর ভোরে একজন চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনা প্রকাশের পর হওয়ার পর বুয়েটসহ সারাদেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বুয়েট শিক্ষার্থীরা বেশকিছু দাবিতে আন্দোলনে নামেন। তাদের সঙ্গে বুয়েট শিক্ষক সমিতি ও সাবেক শিক্ষার্থীরাও একাত্মতা প্রকাশ করেন। দাবি ও আন্দোলনের মুখে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি হত্যার আসামিদের সাময়িক বহিষ্কার এবং হলগুলোতে র‌্যাগিং ও নির্যাতন বন্ধে পদক্ষেপ নেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

মামলা ও বিচার: আবরার হত্যার পরদিন ৭ অক্টোবর তার বাবা বরকত উল্লাহ বুয়েটের ১৯ শিক্ষার্থীকে আসামি করে রাজধানীর চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ১৩ নভেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে মামলাটি পরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল- ১ এ বিচারের জন্য স্থানান্তর করা হয়। ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আদালতের বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। একই বছরের ৫ অক্টোবর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। বিচারকালে রাষ্ট্রপক্ষে ৬০ জন সাক্ষীর মধ্যে ৪৫ জন সাক্ষ্য দেন। এরপর আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য হয়। সাক্ষ্য গ্রহণের দুই পক্ষের যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর রায় দেয় বিচারিক আদালত। অধস্তন আদালতের রায়ের পর ফাঁসির আসামিদের ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি কারাগারে থাকা আসামিরা আপিল করেন। এর ধারাবাহিকতায় বিষয়টি রায়ের পর্যায়ে আসে।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. জসিম সরকার। আসামিপক্ষে জেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান, আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, আজিজুর রহমান দুলু প্রমুখ শুনানি করেন। আসামি মোর্শেদ অমর্ত্য ইসলাম ও মেফতাহুল ইসলাম জিয়নের আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা অনুযায়ী রায় হয়নি। আমরা ন্যাবিচার প্রত্যাশা করেছিলাম। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবো। আশা করি আপিল বিভাগ বিবেচনা করবেন।’