অভ্যুত্থানে আহত নিহতদের জন্য বরাদ্দের প্রস্তাব সিপিডির

জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে যারা আহত হয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে অর্থ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটি মনে করে আহতদের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং কর্মের ব্যবস্থা করতে হবে। নিহতের স্বজনদের জন্য কর্মমুুখী বৃত্তিমূলক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বাজেটে ব্যক্তিপর্যায়ে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ পর্যন্ত করার সুপারিশ করেছে সিপিডি। বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা আছে। যা আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে ৫০ হাজার টাকা বাড়ানোর কথা বলেছে সিপিডি।

গতকাল রবিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে ‘জাতীয় বাজেট ২০২৫-২৬ : সিপিডির সুপারিশমালা’ শীর্ষক বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরে সিপিডি। অনুষ্ঠানে মূল প্রস্তাব তুলে ধরেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। এ সময় সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ও গবেষক মুনতাসীর কামাল ও সৈয়দ ইউসুফ সাদাতসহ অন্য গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেশি। এ ছাড়া, শহরের চেয়ে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অনেক বেশি। সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি। আগামী অর্থবছর এটি বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা উচিত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী জুন শেষে মূল্যস্ফীতির হার ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনার যে পরিকল্পনার কথা বলেছে, সেটি অর্জন করা অসম্ভব হবে না। কারণ এটি বাস্তবসম্মত নয়।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমানে দেশে রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে সহজ কর নীতি দরকার। পাশাপাশি করের আওতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, প্রক্ষেপণের সঙ্গে অর্জনের বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। এটা প্রতিবছর করা হয়। এটি দূর করতে হলে সামনে আদায়ের প্রবৃদ্ধি হতে হবে ৫৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। যা আদায় করা অসম্ভব। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাজস্ব আহরণে কিছুটা গতি এসেছে। তা সত্ত্বেও বর্তমানে যে গতিতে রাজস্ব আহরণ হচ্ছে, তা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি হবে বলে ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন।

মূল্যস্ফীতির বিষয়ে ফাহমিদা খাতুন বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে গড়ে মূল্যস্ফীতি কমেছে। যা ছিল প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। তবে গ্রামে মূল্যস্ফীতি বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবার খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর মুদ্রানীতির পাশাপাশি বাজেটীয় কাঠামোর মধ্যেও পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সরকার গ্যাসের দাম বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা করছে, সেটা করা হলে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে যেতে পারে। সেটি করা হলে  মূল্যস্ফীতির ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য কোনোভাবে অর্জন করা যাবে না।  তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে একটা স্থিতিশীলত এসেছে। যদিও বৈদেশিক বিনিয়োগ সাম্প্রতিক সময়ে হ্রাস পেয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ।  তবে রপ্তানি আয়ে ভাল সাড়া মিলেছে। চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বিদেশে কর্মী প্রেরণ কমেছে। এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।

সিপিডির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২৬ সালেই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর আর কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখতে হবে।

সিপিডি জানায়, রাজস্ব আহরণকারী সংস্থা হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে এনবিআরের নীতি প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়ন পৃথক হতে হবে। বর্তমানে সংস্কারের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। সংগঠনটি ভ্যাট আহরণে স্বচ্ছতা আনয়নের তাগিদ দেয়। এ ছাড়া বছর বছর বন্ডেড ওয়্যারহাউসের লাইসেন্স নবায়নের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটির মেয়াদকাল বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এনজিওর মতের অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের কর ও ভ্যাটে ছাড় দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। আর সরকার বর্তমানে যে কৃচ্ছ্র সাধন নীতি অনুসরণ করছে, তার নেতিবাচক প্রভাব যাতে কোনোভাবেই সামাজিক সুরক্ষা খাতের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখার তাগিদ দেওয়া হয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ইস্যুতে ফাহমিদা খাতুন বলেন, আগের সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। সেখানে প্রচুর অর্থ নয়-ছয় হওয়ায় এ খাতে সংকট ঘনীভূত হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে জনগণের করের টাকা তছরুপ হয়েছে। ধীরে ধীরে ত্রুটিপূর্ণ চুক্তিগুলো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে যে বকেয়া দায়দেনার সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো ধীরে ধীরে পরিশোধ করতে হবে। এ জন্য বাজেটে বরাদ্দ থাকতে হবে।

জ্বালানি সংকট নিরসনে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ওপর তাগিদ দেওয়া হয়। সরকার যে ৩৫টি কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, সেগুলো খননের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। চলতি ২০২৫ সালের মধ্যে এসব কূপ খননের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও এখন পর্যন্ত খনন হয়েছে মাত্র একটি। পাশাপাশি নবায়নযাগ্য জ্বালানিতে ভ্যাট ও আগাম কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিশেষ করে সোল্যার প্যানেলে করছাড় দিতে বলা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য পৃথক তহবিল গঠন এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুবিধা ধীরে ধীরে সংকুচিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এ ছাড়া স্বাস্থ্যখাতে সামগ্রিক বরাদ্দ বাড়াতে হবে। প্রাথমিক স্কুলে মিড ডে মিল সর্বজনীন করার করার উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। সর্বোপরি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য  সমন্বিত ও দূরদর্শী বাজেট প্রয়ণয়ন করতে হবে।