হত্যা মামলায় ২১ বছর আগে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান মো. আনিসুর রহমান (তখন বয়স ২৬ বছর)। এর কয়েক মাস আগে তার দুই চোখ কাঁটাচামচ দিয়ে খুঁচিয়ে উপড়ে ফেলে কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষ। ফৌজদারি মামলায় কারও সাজা হলে তিনি আপিল করতে পারেন অথবা তার আর্থিক অসমর্থতা থাকলে জেল আপিল হয় এটা সংবিধান ও আইনের স্বতঃসিদ্ধ বিধান। আসামির আইনের আশ্রয় নেওয়ার ও বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আনিস ২১ বছর অর্থাভাবে আপিল করতে পারেননি। তার পক্ষে জেল আপিলও হয়নি। জানা গেছে, বরিশালের আদালতে আনিসের বিরুদ্ধে যে রায় হয়েছিল, তার নথি পাওয়া যায়নি।
বরিশাল কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষ দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, কিছুদিন আগে মেডিকেল বোর্ড দৃষ্টিহীন আনিসকে শারীরিকভাবে অক্ষম ও অচল ঘোষণা করেছিল। কারাবিধি অনুযায়ী তাকে মুক্তি দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সরকারের নির্বাহী আদেশে গতকাল বেলা ৩টায় তিনি মুক্তি পেয়েছেন। কারাফটকে তার বোন রাশিদা বেগম তাকে গ্রহণ করেন। এর আগে দুপুরে আনিসকে কখন মুক্তি দেওয়া হবে জানতে চাইলে কারা কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট সময় না জানিয়ে বলে গতকাল (মঙ্গলবার) বা আজ (বুধবার) তাকে মুক্তি দেওয়া হবে।
কিন্তু আপিল ছাড়া তার ২১ বছর কারাবাস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো সদুত্তর মেলেনি। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সাজাপ্রাপ্ত আসামি আপিল করলে তার দোষ-গুণের বিচার করবে আদালত, সবকিছুই হবে সংবিধান ও আইন মোতাবেক। আসামির আপিল না হওয়া, একজন অক্ষম ও শারীরিকভাবে প্রায় অচল আসামিকে কারাগারে রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও অবিচার।’
আনিসের গ্রামের বাড়ি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার মন্ডুপাশা গ্রামে। অবিবাহিত আনিস ১৯৯৪ সালে এসএসসি পাস করেন। চার ভাই, তিন বোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। গত এক মাসে বরিশালের উজিরপুর, বরিশালের আদালত, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখা ও আনিসের গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে তার পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছে দেশ রূপান্তর। বরিশালের সংশ্লিষ্ট আদালতের বিভিন্ন দপ্তর, হাইকোর্ট বিভাগের জেল আপিল শাখায় অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার ব্যাপারে রায়ের নথি পাওয়া যায়নি। ওই সময়ের রেজিস্ট্রার খাতায় দেখা গেছে, মামলার কোনো নথি সংরক্ষিত নেই।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ২২ ডিসেম্বর উজিরপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বরিশাল বিএম কলেজের শিক্ষার্থী সাইদুল খুন হন। হামলায় আরও তিনজন আহত হন। এ ঘটনায় স্থানীয় থানায় একটি হত্যা মামলা করেন নিহত সাইদুলের বাবা সাবেক ইউপি সদস্য মন্নান হাওলাদার। আসামি করা হয় আনিসসহ ১২ জনকে। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কের শুনানি নিয়ে বরিশালের দায়রা জজ আদালত ২০০৩ সালের ৩ আগস্ট আনিসকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়। এ মামলায় আরও ১০ জনকে সাজা দেওয়া হলেও তাদের বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। রায়ের সময় পলাতক আনিসের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। একই বছরের ১৭ আগস্ট এলাকায় গেলে কিছু মানুষ কাঁটাচামচ দিয়ে আনিসের দুই চোখ উপড়ে ফেলে। বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে অস্ত্রোপচার হলেও আনিসের দুটি চোখ চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। কিছুটা সুস্থ হলে ২০০৪ সালের ৩০ জানুয়ারি তাকে সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানো হয়।
গত ১৪ মার্চ দুপুর ২টার পর প্রতিবেদকদ্বয় বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে আনিসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। লোহার গ্রিলের ওপাশে দাঁড়ানো ছোটখাটো আনিসের চোখ কালো চশমায় ঢাকা। মাথার চুল ছোট করে কাটা। পরনে নীল রঙের টি-শার্ট ও লুঙ্গি। আনিস জানালেন, কারাগারে যাওয়ার পর তিনি আপিলের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তার পক্ষে জেল আপিলের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বরিশাল কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, রায়ের নথি পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, কারাগারে তাকে চলতে হয় অন্যের দয়ার ওপর। শৌচাগারে যাওয়া, গোসল, খাওয়া, এখান থেকে সেখানে যাওয়া সবই করতে হয় অন্যের সহযোগিতায়।
আনিস তখন বলেছিলেন, চোখে অস্ত্রোপচারের পর যে ধরনের যতœ নিতে হয়, সেটি হয়নি। মাঝেমধ্যে চোখে তীব্র ব্যথা হয়। অনবরত পানি পড়ে। তখন কারা হাসপাতাল থেকে ব্যথার ওষুধ এনে খান। উন্নত চিকিৎসা হলে কিছুটা স্বস্তি পেতেন। কিন্তু মুক্তি না পাওয়ায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। আনিস দাবি করেন, কারাগারে ভালো আচরণ ও অন্যান্য কারণে ২ হাজার ৪৩৯ দিন রেয়াত পেয়েছেন। বলেন, ‘আমার তো আর শাস্তির দরকার নাই। দুইডা চোখ নাই। জীবনডা গেল জেলে। আমার তো এহন খাইয়া পইড়া বাইচ্যা থাকনের মতো অবস্থা নাই।’ তিনি বলেন, ‘আমারে যাবজ্জীবন সাজা দিল, কিন্তু আমারে যারা অন্ধ করল তাদের বিচার কি হইবে না?’ তিনি আরও জানান, ২০০৪ সালে তার স্বাক্ষর নিয়ে একটি জেল আপিলের আবেদন হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হলেও রায়ের নথি সংযুক্ত না থাকায় সেটি ফেরত আসে বলে তাকে জানানো হয়।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ঘটনার ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন শব্দটি ছোট হবে। জঘন্যতম মানবাধিকারের একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি হলো। আসামি যত বড় অপরাধীই হোক বিনা বিচারে তাকে কারাগারে রাখা যায় না। এ আসামি আপিল করলে তো খালাসও পেতে পারতেন। মামলাটির নিষ্পত্তি হতো।’ তিনি বলেন, ‘এ আসামি দুবার নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন। প্রথমবার তার চোখ উপড়ে ফেলা হল। দ্বিতীয়বার যাবজ্জীবন সাজা হলেও অনেকটা বিনা বিচারে তাকে কারাগারে থাকতে হলো।’
কারাবিধি ৫৯৬ ও ৭৭১ মোতাবেক আনিসের মুক্তি চেয়ে গত ১৮ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মাসুদ পারভেজ কারা মহাপরিদর্শক, বরিশালের জেলা প্রশাসক, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার, একই কারাগারের জেলার ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উদ্দেশে পাঠানো নোটিসে আনিসের বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
নোটিসদাতা অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আনিসের সাজার বিরুদ্ধে কোনো আপিল হয়নি বলে নিশ্চিত হয়েছি। একজন অন্ধ মানুষকে আপিলের সুযোগ না দেওয়া মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। মানবিক কারণে আইনি নোটিসটি দিয়েছি।’
বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন ভূঞা গত সোমবার মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আনিসের মুক্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’ তার পক্ষে আপিল হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বিস্তারিত না জেনে বলতে পারব না।’ গতকাল দুপুরে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আনিসের আপিলের রেকর্ড কারাগারে নেই। সে সময় যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা বলতে পারবেন।’ সন্ধ্যায় যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘বিকেল ৩টার পর আনিসকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’
অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ তার মুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে ভালো কথা। কিন্তু ২১ বছর আপিল কেন হলো না, এর জবাবদিহি করবে কে? এ ধরনের অবহেলার ঘটনা আরও থাকতে পারে। সংশ্লিষ্টদের সতর্ক ও সংশোধন হওয়া উচিত।’