ধর্ষণের সংজ্ঞা সংশোধন এবং বিয়ের প্রতিশ্রুতি বা প্রতারণার মাধ্যমে অবৈধ যৌনকর্মের সর্বোচ্চ সাজা সাত বছর রেখে গত বৃহস্পতিবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। আর এ অপরাধের বিচার হবে পৃথক ধারায়। অনুমোদিত খসরায় শিশু ধর্ষণ অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণের সংজ্ঞাকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করাসহ বলাৎকারকে ধর্ষণের আওতায় নিয়ে বিচার হবে সংশোধিত আইনে। অনুমোদিত খসড়ায় ধর্ষণের মামলার তদন্ত ও বিচারের সময় কমিয়ে আনা হচ্ছে।
বিয়ের প্রলোভন বা প্রতিশ্রুতিতে সাত বছর সাজাসহ সংশোধন হতে যাওয়া আইন নিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও নারী অধিকার কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। আইনজীবীদের কারও মতে, বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্ককে শাস্তির আওতায় আনা ভুল। কারও মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বিয়ের প্রলোভন বা প্রতারণার মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ককে লঘু অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। অন্যদিকে নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, বিয়ের প্রলোভনে বা অন্যভাবে ধর্ষণকে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করাই উচিত। চূড়ান্ত খসড়ায় এ অপরাধকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিয়ের প্রতিশ্রুতি বা প্রলোভনে বিষয়ে যেটা বলা হয়েছে, সেটাকে অত্যন্ত লঘু অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিষয়টিকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে। অপরাধটাকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘কারও অনুমতি ছাড়া শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা, সেটা বিবাহিত হোক, অবিবাহিত হোক সেটাই তো ধর্ষণ। আর ধর্ষণের মৌলিক বিষয় তো সেটাই যে, কারও অনুমতি ছাড়া শারীরিক সম্পর্ক করা যাবে না এবং এটি একই রকম অপরাধ। এ ধরনের বিধানে ভুক্তভোগীর হয়রানি আরও বাড়বে।’ ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘আমার মনে হয়, তাড়াহুড়ো করে আইনটিতে সংশোধনীতে আনা হচ্ছে। আরেকটু সময় নিয়ে, বিশ্লেষণ করলে মনে হয় ভালো হতো।’ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ মনে করেন, বিদ্যমান বাস্তবতায় বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের কারণে সাত বছরের সাজার বিধান রাখা যৌক্তিক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হাজার হাজার মামলা হয় ধর্ষণের। কিন্তু সব ধর্ষণ মামলা কিন্তু মাগুরার সেই শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মতো নয়। মাগুরায় ওই ঘটনায় আসামিদের ফাঁসির দ-ের দাবি যৌক্তিকভাবেই উঠছে এবং এটাই স্বাভাবিক।’ তিনি বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্ক দুজন নারী, পুরুষ সম্পর্কে জড়ানোর পর সম্মতির মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্ক হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর যেকোনো কারণে মনোমালিন্য হলে এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে মামলার বহু উদাহরণ রয়েছে। মামলাগুলো প্রমাণ করা যদিও কঠিন। এখন বিয়ে বা অন্য প্রলোভনে ধর্ষণের মামলার ক্ষেত্রে তো আসামিকে ফাঁসি দেওয়া যায় না এবং এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে ফাঁসি দিলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হবে। কেননা সম্মতির মাধ্যমে কিন্তু অনেকের শারীরিক সম্পর্ক হয়। আমার মনে হয় আইনের এ বিধানটি যৌক্তিক।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া গত বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘আজ (২০ মার্চ) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনী-সংক্রান্ত খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে কেবিনেট (উপদেষ্টা পরিষদ)। সংশোধনীতে যথেচ্ছ মৃত্যুদ-ের বিধান রাখার ফলে মামলার বিচার ঝুলে যাবে।’ ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া লেখেন, ‘বিবাহের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ককে ধর্ষণের আওতাভুক্ত করা চরম ভুল এবং আইনের মূল নীতির পরিপন্থী। ধর্ষণের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো সম্মতি। বিবাহের প্রলোভনের নামে শারীরিক সম্পর্ক এবং পরে বিবাহে অস্বীকৃতি বড়জোর প্রতারণার অপরাধ হতে পারে, কোনোমতেই ধর্ষণ নয়। এখানে জোর-জবরদস্তির অনুপস্থিতি মামলা প্রমাণের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংশোধিত হতে যাওয়া আইনে প্রাপ্তবয়স্ক দুজনের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো। আবার সেখানে বলা হচ্ছে, দুজনের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক থাকতে হবে। ২০২৫-এ এসে এই ধরনের অদ্ভুত আইন হতে পারে না। এই যে বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হলো, এতে করে মামলার সংখ্যা বাড়বে এবং মামলাবাণিজ্য বাড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তাদের মধ্যে বিয়ের প্রতিশ্রুতি হলো কি হলো না, তারা যদি নিজেদের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্কে জড়ায় তাহলে সেটাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া, তাও শুধু একটি পক্ষকে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।’