একনেক সভা আজ

প্রকল্প সংশোধনের ছড়াছড়ি

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ রবিবার। এটি চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অষ্টম সভা। এ সভায় মোট ১৫টি প্রকল্প তোলা হচ্ছে অনুমোদনের জন্য। এর মধ্যে সাতটি প্রকল্পই সংশোধনের জন্য তোলা হচ্ছে। এই সাত প্রকল্পের  মধ্যে এমনও প্রকল্প রয়েছে, যে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তা সত্ত্বেও সেসব প্রকল্প সংশোধনের অনুমোদন দিতে যাচ্ছে একনেক। তাছাড়া বিগত সরকারের সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অব্যবস্থাপনা এবং অর্থ অপচয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ ছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সেই প্রকল্পগুলো বহাল তবিয়তে রয়েছে। মূলত প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যারা যুক্ত তারা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। ফলে আগের সরকারের তৈরি করা নানা অব্যবস্থাপনার জের বর্তমান সরকারকেও টানতে হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের জয়গান শোনাত বারংবার। সে জন্য তারা অনেক বেশি প্রকল্প গ্রহণ করত। এসব প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ বরাদ্দ প্রাক্কলন করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নে বাস্তবে যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তার চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার নজির রয়েছে অহরহ। এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুললে সরকারের তরফ থেকে নানা হয়রানির শিকার হতে হতো। প্রকল্পগুলোর অন্যতম সুবিধাভোগী এগুলো প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এছাড়া ঠিকাদার, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ঠিকাদার, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিসহ নানা স্তরের মানুষ প্রকল্প থেকে সুবিধা পেয়ে থাকেন। এসব কাজে নিযুক্তরা নিজেদের স্বার্থে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যয় বাড়িয়ে নিতেন।

আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তন হলেও আমলাতন্ত্র তার চরিত্র বিন্দুমাত্র পাল্টায়নি। ফলে আগের সরকার প্রকল্প বাস্তবায়নের যেসব ফাঁকফোকর তৈরি করেছিল, সেগুলো কাজে লাগিয়েই বর্তমানে আগের সরকারের মতোই একের পর এক প্রকল্প সংশোধন করা হচ্ছে। পাশাপাশি এমন সব প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে যেগুলো অর্থনীতিতে আশু কোনো সুফল দেবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামগ্রিকভাবে প্রকল্পগুলোর জন্য একটি পর্যালোচনা দরকার ছিল। যেটা করা সম্ভব হয়নি। ফলে উত্তরাধিকার সূত্রে অন্তর্বর্তী সরকার যেসব প্রকল্প পেয়েছে, সেগুলো চলমান রাখতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে যে বিবেচনাটি কাজ করছে তা হলো যেহেতু এসব প্রকল্পে এরই মধ্যে অনেক অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে, তাই আর কিছু অর্থ ব্যয় করে যদি এগুলো থেকে সুফল নিশ্চিত করা যায়, তাহলে মন্দ হয় না। তবে এই সুযোগে হয়তো অনেক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প অনুমোদন পেয়ে যাচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে এক্ষেত্রে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্পগুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা দরকার ছিল।

আজ একনেক সভায় যেসব প্রকল্প উত্থাপন করা হচ্ছে তার মধ্যে একটি প্রকল্প হচ্ছে ‘পায়রা সমুদ্রবন্দরের প্রথম টার্মিনাল এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্প। প্রকল্পটি দ্বিতীয় মেয়াদে সংশোধনের জন্য উত্থাপন করা হচ্ছে। এটি এমন একটি প্রকল্প যেটির অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দরের অবকাঠামো নির্মাণ ও ড্রেজিংয়ের পেছনে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হলেও বাস্তবে এ সবের সুফল মিলছে না। নাব্য সংকটের কারণে মালবাহী সমুদ্রগামী বিদেশি বড় জাহাজ এ বন্দরে ভিড়তে পারছে না। সমুদ্র উপকূল থেকে এ বন্দরে যাতায়াতের একমাত্র নৌপথ রাবনাবাদ চ্যানেলের অনেক স্থানের গভীরতা কমতে কমতে বর্তমানে মাত্র ৫ দশমিক ৪ মিটার বা ১৮ ফুটে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় জোয়ারের সময় মাত্র ১৪-১৫ হাজার টন কয়লাবাহী বিদেশি জাহাজ চলাচল করতে পারছে। অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ অনেক নদীবন্দরে যাতায়াতের নৌপথে এর চেয়ে বেশি গভীরতা রয়েছে। পায়রা যদি চালু রাখতে হয়, তাহলে অনেক বেশি ড্রেজিং করার প্রয়োজন হবে। যে বিষয়কে সম্ভাবনাময় মনে করেন না সংশ্লিষ্টদের অনেকে। নতুন করে পায়রা বন্দর প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় নির্ধারণ করা হচ্ছে ৫ হাজার ৪২৭ কোটি টাকা। যা প্রথম সংশোধনীর তুলনায় ৯১১ কোটি টাকা বেশি। আর প্রকল্পটির মূল বাস্তবায়ন ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও প্রকল্পটি থেকে কতটা অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত হয়।

সংশোধনীর তালিকায় আরও রয়েছে চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ে ও ট্যাক্সিওয়ের শক্তি বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প। এটি প্রথমবার সংশোধন করা হচ্ছে। আর এ সংশোধনের ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ছে প্রায় ৮২ কোটি টাকা। যদিও এ ব্যয়বৃদ্ধির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। তা সত্ত্বেও পরিকল্পনা কমিশনের মতামত অগ্রাহ্য করেই প্রকল্পটি একনেকে উঠছে। প্রকল্পটির মূল্য ব্যয় প্রাক্কলন ছিল ৫৪০ কোটি টাকা। সংশোধনী প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬২২ কোটি টাকা।

সায়দাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্প ফেজ-৩ শীর্ষক প্রকল্পটি দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন হচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ছে ৮ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্পটি গ্রহণ করে। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। কথা ছিল যে এটি ২০২০ সালে সম্পন্ন হবে। কিন্তু তা হয়নি। ফলে মাঝে একবার প্রকল্পটি সংশোধন করে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। আর ব্যয় বাড়িয়ে ৭ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু সংশোধিত সময়েও প্রকল্পটি শেষ হয়নি। এখন আবার সংশোধন করা হচ্ছে। এবার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। এভাবে দফায় দফায় ব্যয় ও মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের সুফল থেকে নাগরিকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

সংশোধনীর তালিকায় আরও রয়েছে বাংলাদেশ-চায়না এক্সিবিশন সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প। এটিও দ্বিতীয়বারের মতো সংশোধন করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে গ্রহীত প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালে। পূর্বাচলে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটি চালু করা হলেও এখনো ধাপে ধাপে এটির কাজ বাড়ানো হচ্ছে। মূলত চীন সরকারের অনুদানে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সে অনুদানে প্রকল্পের অর্ধেক ব্যয়ও মিটছে না। প্রকল্পটিতে নতুন করে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। মূল ব্যয় ছিল ৭৯৬ কোটি টাকা। বাড়তি ব্যয় মেটাতে সরকার ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর নিজস্ব তহবিল থেকে মোট ১ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা জোগান দিতে হচ্ছে। সংশোধনের তালিকায় থাকা অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল কানেক্টিভিটি শক্তিশালীকরণে সুইচিং ও ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন (তৃতীয় সংশোধিত), পঞ্চবটি   থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ ও দ্বিতল সড়ক নির্মাণ (প্রথম সংশোধিত), ঢাকা শহরের সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত) এবং স্মার্ট পেমেন্ট মিটারিং প্রজেক্ট ইন ডিস্ট্রিবিউশন জোনস অব বিপিডিবি (প্রথম সংশোধিত) প্রকল্প।