বরকতময় সময়ের গুরুত্ব

প্রকৃত মুমিন বান্দার বৈশিষ্ট্য হলো, তার জীবনে সব চাওয়া-পাওয়া ও হিসাবনিকাশ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যই পরিচালিত হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বাইরে তারা অন্য কোনো পছন্দ ও অপছন্দকে অগ্রাধিকার দিতে পারে না। বিষয়টি সহজ নয়। তবে এটাও ঠিক যে, কোনো পুরস্কার অর্জনের পথই সহজ নয়। দুনিয়ার সাময়িক জীবনে যারা আল্লাহর দেওয়া বিধান ও নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দিয়েই জীবন পরিচালনা করতে পারবেন, একমাত্র তাদের জন্যই আল্লাহতায়ালা পরকালে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।

কিন্তু এ পথে অগ্রসর হওয়ার পথে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কেননা মানুষকে আল্লাহতায়ালা সহজাতভাবে দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। আজ থেকে বহু বছর আগে যখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সেই অর্থে যাত্রা শুরু করেনি, তখনো মানুষ জীবনের মোহে পড়ত। আর এখন তো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনন্য এক উৎকর্ষতায় মানুষ অবস্থান করছে। মানুষের জীবন এখন অনেক বেশি সহজ, বিলাসবহুল ও আরামদায়ক। তাই একদিকে যেমন জীবনের এই উন্নতমান ধরে রাখার উদ্দেশে নিত্যদিনের লড়াই করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়, তেমনি আবার প্রতিনিয়ত জীবনের প্রলোভনে আর মোহে আক্রান্ত হয়ে যায়। পার্থিব বিলাসিতা আর শয়তানের প্রবঞ্চনা মুমিনকে শুধুই বিচ্যুতই করতে চায়। বৈষয়িকতাকেন্দ্রিক এ ডামাডোলে বিচরণ করতে করতে মানুষের মনটাও একটা সময়ে কলুষিত হয়ে যায়। ফলে আল্লাহতায়ালা যে ইবাদতগুলো মুমিনের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন, সেই ফরজ ইবাদতগুলো আমল করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা চলে আসে। অন্যদিকে নফল ইবাদত বা অতিরিক্ত কোনো ইবাদত করার মানসিকতাই অনেক সময় আর বিদ্যমান থাকে না।

ইবাদত বা আমল না করা কিংবা ইবাদত পালন করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা আমাদের যাপিত জীবনের একমাত্র সংকট নয়। বরং প্রকৃত সমস্যা আরও অনেক বেশি প্রকট। আল্লাহ যে কারণে ইবাদতগুলো সম্পাদন করতে বলেছেন, যেভাবে করতে বলেছেন, অন্তর কলুষিত হয়ে যাওয়ার পর মুমিন আর সেই চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইবাদত করতে পারে না। তাই ইবাদত করে বান্দার মন যেমন স্বস্তি পায় না, ঠিক তেমনি সংশ্লিষ্ট আমলকারী ব্যক্তির মনে, মননে ও চিন্তাদর্শনে ইবাদতগুলোর যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা, সেটাও সেভাবে লক্ষ করা যায় না।

আল্লাহতায়ালা যেহেতু মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাই মানুষের এসব সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন। এ কারণেই মুমিনের ইমানি চেতনা যেন জোরদার হয়, সে তার দুর্বলতাগুলো যাতে কাটিয়ে উঠতে পারে, দ্বীনের প্রতি তার দায়বদ্ধতা ঝালাই করে নিতে পারে, তা নিশ্চিত করার জন্য আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্য অনেকগুলো সুযোগ করে দিয়েছেন। চেতনার দুর্বলতাগুলো দূর করার উদ্দেশে একে নবায়ন করার মতো সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে, কিছু স্থানকে অন্য স্থানের চেয়ে বরকতময় ঘোষণা করেছেন, কিছু সময়কে অনেক বেশি বরকতময় ঘোষণা করেছেন। আবার মানুষ হিসেবেও কাউকে অন্যের থেকে এগিয়ে রেখেছেন, আবার কাউকে হয়তো একটু অনগ্রসর অবস্থায় রেখেছেন। এটা পুরোপুরি আল্লাহর ইচ্ছাধীন।

এ কারণেই পৃথিবীর সব জায়গা একই ধরনের বরকতময় নয়। মক্কায় মসজিদে হারামে গিয়ে কেউ এক ওয়াক্ত নামাজ পড়লে, অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় এক লাখ গুণ বেশি সওয়াব হাসিল করা যায়। এ ক্ষেত্রে একক একটি স্থান হিসেবে মক্কা যেমন পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরকতময়। ঠিক তেমনি বছরের কিছু সময় আছে, যা অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বরকতময়। যেমন রমজান মাস। রমজান মাসের শেষ ১০ দিন, জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন প্রভৃতি। আমরা অনেকেই এই বরকতময় সময়গুলোর গুরুত্ব বুঝি না, তাই এ সময়গুলোকে কাজেও লাগাতে পারি না, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা