দেশে বর্তমানে মানুষের অবস্থা ২০২২ সালের তুলনায় খারাপ হয়েছে। অর্থাৎ ২০২৪ সালে বেড়েছে দারিদ্র্য হার এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা। দুই বছর আগে মানুষ যেমন ছিল এখন তারা তার চেয়ে খারাপ আছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ধারণা জরিপের (পার্সেপশন সার্ভে) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। গতকাল সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংস্থাটির কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সেমিনারে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হকের সভাপতিত্বে সেমিনারে সার্ভে প্রতিবেদন তুলে ধরেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. মোহাম্মদ ইউনূস। এ সার্ভেটি ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের সহায়তায় এবং বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন ড. মোহাম্মদ ইউনূস। সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামের বাংলাদেশ ইনচার্জ সিসেমানি পারসেসমেন্ট।
২০২২ সালে সর্বশেষ জরিপ পরিচালিত হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালে জরিপ পরিচালনা করা হয়।
এ প্রসঙ্গে ড. মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপের সঙ্গে বিআইডিএসের এই ধারণা জরিপের তুলনা হবে না। তবে বর্তমানে মানুষের অবস্থা যে খারাপ সেটি আমরা পেয়েছি। যেটি বাস্তবতার সঙ্গে মিল রয়েছে। তিনি জানান, ২০২২ সালের হিসাবে দেশে গরিব মানুষ ছিল ২৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের জরিপের তথ্যমতে, সেটি বেড়ে হয়েছে ২৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সেই সঙ্গে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৬ দশমিক ০৬ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে গ্রামে দরিদ্র মানুষের হার ২০২২ সালের ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৪ দশমিক ১০ শতাংশ, একইভাবে অতিদরিদ্র মানুষের হার ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এদিকে শহরে দারিদ্র্য মানুষের হার ২৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এ ছাড়া অতিদারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকায় দারিদ্র্য হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে হয়েছে ২৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অতিদারিদ্র্যের হার একই অর্থাৎ ৮ দশমিক ৮০ শতাংশই রয়েছে। খুলনায় দারিদ্র্য হার ২২ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে ২৬ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। রংপুরে দারিদ্র্য হার ২৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এ ছাড়া সিলেটে দারিদ্র্য হার ২৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ২০২২ সালে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগত ৩৮ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ৩ শতাংশে।
সভাপতির বক্তব্যে ড. এ কে এনামুল হক বলেন, ২০২২ সালে করা বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপের তথ্যের সঙ্গে এ ধারণা জরিপের তুলনা না হলেও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বুঝতে বিআইডিএসের এ জরিপটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের নীতিনির্ধারণে এসব তথ্য ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দারিদ্র্য হার বেড়ে যাওয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে। এসবের মধ্যে রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া, দেশে বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং রাজনৈতিক কারণ ইত্যাদি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিসেমানি পারসেসমেন্ট বলেন, এ জরিপটির বিবিএসের জরিপের সঙ্গে তুলনা না চললেও বর্তমান পরিস্থিতি বোঝাতে এটি বেশ কাজে দেবে। এর ফলে সরকারের যেকোনো নীতিনির্ধারণ অনেক বেশি সঠিক হবে। পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. দীপঙ্কর রায় বলেন, বিআইডিএসের জরিপের সঙ্গে বিবিএসের জরিপের কখনো তুলনা করা যাবে না। এটা তুলনা করলে ভুল হবে।