রঙিন স্বপ্নের মঞ্চ আইপিএল, কিন্তু সবার জন্য না

ইংলিশ একটি পাবের দরজা দিয়ে এক ভদ্রলোক প্রবেশ করে পানীয়ের অর্ডার দিয়ে বসলেন টেবিলে। চারদিকে হালকা কথোপকথনের গুঞ্জন, ক্লান্ত কর্মব্যস্ত মানুষের মুখে দিনশেষের প্রশান্তির ছাপ। পাবের দুই বিশাল স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)। বিশাখাপত্তনমের এক সন্ধ্যায় লখনৌ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে দিল্লি ক্যাপিটালস লড়াই করছে ২০৯ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করতে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এই জমজমাট ম্যাচে পাবের কেউই বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

এপ্রিলের শুরুতে ইংল্যান্ডে যখন কাউন্টি ক্রিকেট মৌসুম দোরগোড়ায়, তখন ভারতীয় উপমহাদেশে আইপিএলের রঙিন জগৎ ছড়িয়ে দিচ্ছে তার উত্তাপ। টুর্নামেন্টটি কেবল একটি ক্রিকেট লিগ নয়, এটি একটি বিশাল বিনোদন সাম্রাজ্য, করপোরেট বিজ্ঞাপনের আতশবাজি এবং কোটি কোটি ভক্তের আবেগের মিলনস্থল। কিন্তু ইংল্যান্ডের এই পাবের পরিবেশ যেন বলছিল, আইপিএলের রঙিন ঝলকানিতে সবাই মুগ্ধ হয় না।

ক্রিকেট-উন্মাদনার মাঝেও জীবন চলে নিজস্ব গতিতে। এক কোণে দুই মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক চুপচাপ পানীয় চুমুক দিচ্ছেন। আরেক কোণে কয়েকজন তরুণ কর্মী অফিসের আলাপ জুড়ে বসেছেন, তাদের মাঝে খেলার উত্তেজনা নেই। টেবিলের পাশে বসা মধ্যবয়সী গথ ব্যক্তিটি হঠাৎ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এখন তো জমে উঠেছে!' কুলদীপ যাদব রান আউট হয়ে গেছেন, দিল্লির দরকার ১৮ রান, হাতে মাত্র এক উইকেট।

ঠিক তখনই দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন দুই তরুণ, উত্তেজনায় টগবগে। তাদের একজন স্পষ্টতই ম্যাচের ফলাফলের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী। বাজি ধরেছেন কি? নাকি লখনউ সুপার জায়ান্টসের কট্টর ভক্ত? হয়তো। তারা এসেই স্ক্রিনের দিকে তাকালেন, ঠিক তখনই আশুতোষ শর্মার ব্যাট থেকে ছক্কা বেরিয়ে গেল। একজন হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, অন্যজন কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিলেন, 'হয়ে গেছে ভাই, মেনে নাও।'

এরপর কী? পাবের সকলের চোখ চলে গেল স্ক্রিনের দিকে। যে মানুষগুলো প্রথমে ক্রিকেট নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না, তারাও ধীরে ধীরে আবর্তিত হলেন খেলার উন্মাদনায়। ক্যামেরায় ভেসে উঠল বিশাখাপত্তনমের স্টেডিয়ামের উন্মত্ত ভক্তদের চিত্র—রঙিন মুখ, পতাকা হাতে আনন্দ আর হতাশার সংমিশ্রণ।

তবে সবার কাছে আইপিএল সমান গুরুত্ব বহন করে না। দরজার পাশ দিয়ে দ্রুত ঢুকে গেলেন এক ভদ্রলোক, মাথায় ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের অফিশিয়াল উলের টুপি। কী মনে করে এসেছেন? মনে হলো, খেলা দেখতে এসেছেন, কিন্তু না—তিনি তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন ওয়াশরুমে, খেলা দেখার সামান্য ইচ্ছাও প্রকাশ করলেন না।

আশুতোষ শর্মা আরেকটি বিশাল ছক্কা হাঁকালেন, দিল্লি ক্যাপিটালস জয় নিশ্চিত করল। গথ ব্যক্তিটি আনন্দে বলে উঠলেন, 'হয়ে গেল!' পাবের লোকজন তখনও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে, কেউ মুচকি হাসছেন, কেউ কৌতূহলী দৃষ্টিতে দেখছেন খেলার শেষ মুহূর্তগুলো।

এই পুরো দৃশ্য যেন আইপিএলের প্রতি ইংল্যান্ডের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিচ্ছবি। ২০২৫ সালের আসরে মাত্র ১০ জন ইংলিশ ক্রিকেটার খেলছেন, যা গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বেন স্টোকস একেবারেই অংশ নিচ্ছেন না, হ্যারি ব্রুকও কিছুদিন আগে নিজের নাম প্রত্যাহার করেছেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, তারা আগামী দুই আসরেও হয়তো খেলতে পারবেন না।

একসময় ইংল্যান্ডের ক্রিকেট সমাজ আইপিএলের প্রতি ঈর্ষাকাতর ছিল, এরপর ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে, ইয়ন মরগানের মতো খেলোয়াড়দের মাধ্যমে তা আরও দৃঢ় হয়। কিন্তু এখন? যেন একটা নিঃশব্দ দূরত্ব তৈরি হয়েছে। স্টোকস ও ব্রুকের মতো তারকারা ইংল্যান্ডের হয়ে খেলার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন, বিশেষ করে সামনে যখন ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ, অ্যাশেজ এবং ধুঁকতে থাকা ওয়ানডে দলকে পুনরুজ্জীবিত করার চ্যালেঞ্জ।

আমিও হয়তো এই দৃষ্টিভঙ্গির দলে পড়ে যাই—স্বীকার করতেই হবে, আইপিএল আমাকে খুব একটা টানে না। কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের ঘনঘটা, একের পর এক উচ্চ-স্কোরের ম্যাচ, প্রায় দুই মাস ধরে চলা ক্রিকেট-উন্মাদনা—সব মিলিয়ে কখনো কখনো একঘেয়ে লাগতে পারে। তবে এটাকে অস্বীকার করা যাবে না, আইপিএল এখন ক্রিকেটবিশ্বের অদম্য বাস্তবতা।

ক্রিকেটের জগৎ বিশাল, এখানে কাউন্টি ক্রিকেটের স্নিগ্ধতা যেমন আছে, তেমনি আছে আইপিএলের আগুনঝরা আকর্ষণ। আপনি চাইলে দূর থেকে এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, চাইলে একেবারে গভীরে ডুবে যেতে পারেন। কেউ কেউ ব্যাকগ্রাউন্ডে আইপিএল চালিয়ে জীবন উপভোগ করেন, আবার কেউ কেউ এই জাঁকজমকের বাইরে থেকেই ক্রিকেট ভালোবাসেন।

শেষ পর্যন্ত, ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য এখানেই—এটি এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে সবার জন্য জায়গা আছে।