কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার ‘পুরাতন সম্পর্ক শেষ’ হয়ে গেছে, যা মূলত ‘অর্থনীতির গভীর সংযোগ, নিিদ্র নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে’ গড়ে উঠেছিল। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর অটোয়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মার্ক কার্নি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের জবাবে কানাডিয়ানদের এখন অবশ্যই তাদের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। তিনি বলেন, কানাডাও এখন পাল্টা শুল্ক আরোপ করবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ফেলবে। এর আগে গত বুধবার গাড়ি ও গাড়ির যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর নতুন করে স্থায়ীভাবে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানান, গাড়ি আমদানির ওপর নতুন এই শুল্ক আগামী ২ এপ্রিল থেকে কার্যকর করা হবে। তবে যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে শুল্ক কার্যকর হবে মে মাসে কিংবা তারও পরে।
বিশ্লেষকরা বলছে, ট্রাম্পের শুরু করা এ বাণিজ্যযুদ্ধ (শুল্ক আরোপ) কেবল মৌখিকভাবেই নয় বরং যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক সম্পর্ককে ভীষণভাবে প্রভাবিত করবে। পরবর্তীদের দুই দেশের শীর্ষ নেতার বদল হলেও তা সাবেক অবস্থানে হয়তো ফিরবে না।
মার্ক কার্নি বলেছেন, তার জীবদ্দশায় দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হলো ১৯৬৫ সালে স্বাক্ষরিত ‘কানাডা-ইউএস অটোমোটিভ প্রোডাক্টস অ্যাগ্রিমেন্ট’ (কানাডা-মার্কিন মোটরগাড়ি পণ্য চুক্তি)। এই শুল্কের কারণে এখন সেটি (চুক্তি) শেষ হয়ে গেল।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা শুল্কের মুখেও কানাডা তার অটো শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। তবে এর জন্য সরকার ও ব্যবসায়িক গোষ্ঠীকে একত্রে এই শিল্পকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে ও পুনর্গঠন করতে হবে। তার মতে, কানাডায় এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে যার নিয়ন্ত্রণ কানাডিয়ানদের হাতেই থাকবে। একই সঙ্গে অন্যান্য অংশীদারদের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্য সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করাও জরুরি বলে
মনে করেন তিনি। বিবিসি বলছে, কানাডা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয় বলেও মন্তব্য করেন মার্ক কার্নি।
এদিকে নতুন শুল্ককে মোকাবিলা করতে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি তার প্রচার পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কানাডার পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আংশিকভাবে আরোপ করেছে। পাশাপাশি, অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত আমদানিতেও ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে। এ কারণে কানাডা এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার (৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩২ বিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড) মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার ভোরে ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সতর্ক করে বলেছেন, তারা যদি এই বাণিজ্য যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একজোট হয়, তাহলে তাদের ওপর ‘বৃহৎ পরিসরের’ শুল্ক আরোপ করা হবে। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করে ট্রাম্প লেখেন, যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন কানাডার সঙ্গে জোট বেঁধে যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে, তবে তাদের উভয়ের ওপর বর্তমানে নির্ধারিত শুল্কের চেয়ে আরও অনেক বড় পরিসরের শুল্ক আরোপ করা হবে। ট্রাম্পের এমন মনোভাবের পর বৃহস্পতিবার সকালে অটোয়ায় তার মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে ‘বিকল্প বাণিজ্য’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। পরে সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, একটি ফোন কল নির্ধারণ করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং এটি আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে হবে। কানাডার প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভ্রে এই শুল্ককে অন্যায্য ও উসকানিমূলক বলে অভিহিত করেছেন।
বামপন্থি দল এনডিপি, যারা আগে কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল, তারাও বৃহস্পতিবার তাদের প্রচারণা পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনেছে। এনডিপি নেতা জাগমিত সিং কানাডার অন্টারিওর উইন্ডসরে গাড়ি শ্রমিক ও ইউনিয়ন নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। এই শহরটি একটি প্রধান অটো উৎপাদন কেন্দ্র। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক হলো ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প কোনো কারণ ছাড়াই কানাডার বিরুদ্ধে এই বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছেন। তার ভাষ্য, কোনো কোম্পানি যদি এই অতিরিক্ত শুল্কের কারণে কানাডা থেকে তাদের কার্যক্রম সরিয়ে নেয়, তাহলে কানাডায় তাদের গাড়ি বিক্রি নিষিদ্ধ করা উচিত। এই মাসের শুরুতে, লিবারেল নেতা হওয়ার পর এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগে, মার্ক কার্নি এক ভাষণে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পিয়েরে পয়লিয়েভ্রেকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ভক্তি করেন, তিনি-ই তার সামনে মাথা ঝোঁকাবেন এবং বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন না। কানাডিয়ানরা আগামী ২৮ এপ্রিল আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দেবে। জাস্টিন ট্রুডো পদত্যাগ করার পর প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার ৯ দিনের মাথায় গত ২৩ মার্চ মার্ক কার্নি আগাম এই পার্লামেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দেন।