আজ সন্ধ্যায় পশ্চিমাকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গেলে আগামীকাল ঈদুল ফিতর। যদি চাঁদ দেখা না যায়, তাহলে রমজান মাস ত্রিশ দিনে পূর্ণ হবে এবং পরশু ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। মুসলিম উম্মাহর কাছে ঈদুল ফিতর এক আনন্দঘন অনুষ্ঠান। ঈদের দিনে ঈদের ময়দানে উপস্থিত হয়ে নামাজ আদায় করা বড় ইবাদত। ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এর পেছনে রয়েছে ধর্মপ্রাণ মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং নিবেদিত প্রাণের আকুতি।
সংগত কারণেই এবারের ঈদ ভিন্নমাত্রা পাবে। তবে ঈদুল ফিতরের অনুপম বৈশিষ্ট্য সব দিক দিয়েই অনন্য। এর অন্যতম হলো- প্রতিদিনের নামাজ, সাপ্তাহিক জমায়েত এবং বার্ষিক পুনর্মিলনী, এই তিনটিই ঈদের মধ্যে দেখা যায়।
ঈদুল ফিতরের দিনটিতে মুসলমানরা ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে একত্র হন। তারা সমবেত হন রাব্বুল আলামিনের প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য। মাহে রমজানে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য যে দায়িত্ব বর্তায়, তা সুচারুরূপে সম্পন্ন হওয়ায় ঈদের দিবসে আল্লাহর প্রতি জ্ঞাপন করা হয় কৃতজ্ঞতা। শুধু মুখের কথা কিংবা ধর্মীয় আচার-প্রথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এই প্রক্রিয়া। সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং মানবিক উপলব্ধির মধ্য দিয়েও এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
রোজাদার মুসলমানরা যখন ঈদের দিনে নামাজের জন্য ঈদগাহে আসতে শুরু করে তখন আল্লাহতায়ালা ফেরেশতাদের ডেকে ডেকে বলেন, দেখো ফেরেশতারা, মানুষ সৃষ্টি করার সময় তোমরা বলেছিলে, তারা পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ ও খুন-খারাবিতে লিপ্ত থাকবে। এখন দেখো, কীভাবে আনুগত্যের নিদর্শনস্বরূপ তারা আমরা দিকে অগ্রসর হচ্ছে! হে ফেরেশতারা, তোমরা তাদের অভ্যর্থনা জানাও এবং বলে দাও, আমি আল্লাহ তাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দিয়েছি। আল্লাহর তরফ থেকে রোজাদার মুসল্লিদের মধ্যে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত ঘোষণার দিনই হলো ঈদুল ফিতর। তাই রমজান শেষে ঈদুল ফিতর হলো রোজাদারদের পুরস্কারের দিন।
ঈদের প্রচলন হয় হিজরি দ্বিতীয় সনে। ঈদুল ফিতর বিশ্ব মুসলিমের সাম্য ও সমতার উদ্দীপনাকে উজ্জীবিত করে। পৃথিবীর সব মুসলমান একই আনন্দে বৈভবে এবং একই অনুভূতিতে সার্বজনীন ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ঈদুল ফিতরে। ঈদুল ফিতর মানুষের মনকে পরিচ্ছন্ন আলোকে বিকশিত করে তোলে। সব বিবাদ, বিভেদ, অশান্তি, বৈষম্য, জুলুম, অনাচার অশ্লীলতা দূর করে এক পরিশীলিত জীবন চেতনা সঞ্চয়িত হয় ঈদুল ফিতরে। এই ঈদ প্রাচুর্যের ও বরকতের। ঈদুল ফিতর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব সমুন্নত রাখতে প্রতিবছর নির্দিষ্ট তারিখে চন্দ্র সনের আবর্তনে ফিরে আসে।
ঈদুল ফিতর প্রতিবছর আবির্ভূত হয় মানুষে মানুষে ভেদাভেদ দূর করার জন্য। সব মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে এক সুদৃঢ় মানববন্ধন তৈরি করে ঈদুল ফিতর। স্বভাবের চাহিদাসমূহকে উপেক্ষা করে কঠোর আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধির কার্যকর ও বাস্তবরূপ ধারণ করে ঈদুল ফিতর। ঈদের দিনে বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা বারবার উচ্চারিত হয় আল্লাহু আকবর তাকবিরের মাধ্যমে।
ঈদে সৎকাজের সুফল ঘটে। পরম করুণাময় আল্লাহর উদ্দেশে যেসব ভালো কাজ করা হয়, তার সুফল অর্জনের উপলক্ষ এই ঈদুল ফিতর। এ দিনে আল্লাহতায়ালা তার দয়ার প্রাচুর্যে মুমিনদের জীবন ধন্য করেন। যারা মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত, তাদের জন্য আল্লাহর দয়া অসীম। আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা করি, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পালিত এবারের ঈদুল ফিতর আমাদের জীবনে সত্যিকারের শান্তির বার্তা, কল্যাণের উৎস এবং গুনাহ মাফের দিন হয়ে উঠুক।
লেখক : ইমাম ও খতিব, দারোগা আমীর উদ্দিন ঘাট মসজিদ, বাবুবাজার, ঢাকা