শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রায় ২০ অভিযোগ

গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ২০ ধরনের অভিযোগ আনা হচ্ছে। ‘সুপিরিয়র কমান্ডার’ হিসেবে অপরাধের ষড়যন্ত্রকারী, পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে তার বিচারের উদ্যোগ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালের একাধিক প্রসিকিউটর দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে জুলাই-আগস্টে গণহত্যার অভিযোগে প্রধান আসামি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদনের খসড়া ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় এসেছে বলে গতকাল বুধবার জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তবে তদন্তের খসড়ায় অভিযোগ এবং অন্যান্য বিষয় কী আছে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।

অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্তের একটি খসড়া আমাদের হাতে এসেছে। এটি আমরা দেখছি। মূল প্রতিবেদনটি আসতে আরও এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখার পর এটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে। দাখিলের পর শুনানি নিয়ে অভিযোগ গঠন করবে ট্রাইব্যুনাল।’

প্রসিকিউটরদের ভাষ্য, তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা সাপেক্ষে মে মাসের শেষে কিংবা জুনে শেখ হাসিনার বিচার শুরু হতে পারে। তিনি পলাতক থাকলে তার পক্ষে স্টেট ডিফেন্স ল ইয়ার বা রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী শুনানি করবেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের অগ্রগতি ও সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ চারজন প্রসিকিউটরের সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তারা বলেছেন, শেখ হাসিনার মতো ‘হাই প্রোফাইল’ আসামির ক্ষেত্রে কোনো তাড়াহুড়ো করতে চান না তারা। বিচারের সময় বা ভবিষ্যতে বিচারে ত্রুটি ধরা পড়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত তারা নেবেন না। এ কারণে তদন্ত হচ্ছে নিখুঁতভাবে। তদন্তের বেশিরভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

প্রসিকিউটররা জানান, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হবে। এরপর আসামিপক্ষকে হাজির করার জন্য কিংবা শুনানির প্রস্তুতির জন্য সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী তিন সপ্তাহ সময় দেওয়া হবে। এরপর আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হবে।

ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করেন এমন একজন প্রসিকিউটর নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদুল ফিতরের ছুটির আমেজ থাকবে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে বা শেষের দিকে শেখ হাসিনার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন হাতে এলে তা যাচাই করতে যাবে আরও কয়েক দিন। এরপর প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হবে। উপস্থাপনের পর আসামিপক্ষকে প্রস্তুতির জন্য সময় দেওয়া হবে। মে মাসের শেষ সপ্তাহে বা জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ বিচার শুরু হতে পারে।’

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত নিখুঁত করতে যৌক্তিক সময়ের প্রয়োজন। এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদনটি আমাদের হাতে আসবে। এরপর সেটির যাচাই শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে।’

বিচার কবে শুরু হতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটি নির্ভর করছে তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর।’ মে মাসের শেষে বিচার শুরু হতে পারে। তিনি বলেন, একটি প্রতিবেদন (আশুলিয়ায় গুলি করে হত্যার পর লাশ পোড়ানো) প্রসিকিউশনের হাতে এসেছে। কয়েক দিনের মধ্যে আরও কয়েকটি প্রতিবেদন আসবে। এগুলো যাচাই করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হবে। যেহেতু আশুলিয়ার প্রতিবেদনটি আগে এসেছে তাই এর ভিত্তিতে বিচারের উদ্যোগ নেওয়া হবে আগে।

প্রসঙ্গত, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনা ওই দিন ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দপ্তরের হিসেবে অভ্যুত্থান ঠেকাতে ১৪০০ জনকে হত্যা করা হয়। গত বছরের ৮ আগস্ট নোবেলবিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার গণহত্যার বিচার করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনও সংশোধিত হয়।

পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের ১৭ অক্টোবর। ওই দিনই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। এরপর আওয়ামী লীগের সময় গুমের অভিযোগের মামলায় এবং শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের মামলায় শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করার পরোয়ানা জারি হয়। তাকে গ্রেপ্তারে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে জুলাই-আগস্ট গণহত্যার অভিযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এসেছে ৩০০ শর মতো। মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়েছে ২৩টি। শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬০ জনের মতো। তাদের বেশির ভাগ পরোয়ানা জারির আগেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী আছেন অন্তত ১০ জন।

হাসিনার বিরুদ্ধে প্রস্তুত হচ্ছে ২০ অভিযোগ

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা বলেন, জুলাই-আগস্টে দেশ জুড়ে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বিস্তর। এসব অপরাধে মূল ‘মাস্টার মাইন্ড’ বা ‘সুপিরিয়র কমান্ডার’ শেখ হাসিনা। সুপিরিয়র কমান্ডার হিসেবে তার বিচার হবে। তার বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, নেতৃত্ব, উসকানি, প্ররোচনা, হত্যা ও নির্যাতনের নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারী হিসেবে এবং হত্যাকাণ্ডে বাধা না দেওয়া, চিকিৎসায় বা সুরক্ষায় বাধা সৃষ্টির ২০টির মতো অভিযোগ প্রস্তুত করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শেখ হাসিনা সরাসরি কাউকে হত্যা করেননি। কিন্তু শত শত মানুষের মৃত্যুর দায় তার। তিনি হত্যাকাণ্ডের সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নির্দেশ দিয়েছেন। এত প্রাণহানির পরেও তিনি কাউকে নিয়ন্ত্রণ করেননি। তাড়াহুড়োর বিচারের চাইতে তার নিখুঁত বিচার জরুরি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে একটু সময় নেওয়া হবে।’ বিচারের শুনানিকালে শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ সাজার আরজি চাওয়া হবে কি না, এমন প্রশ্নে কয়েক দিন আগে অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘প্রাপ্ত সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

বিচার হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক

অতীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শীর্ষ আসামিদের বিচার হয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং তাদের ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির দায়ে বিচার হয়েছে। জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারেও শীর্ষ অপরাধীদের বিচার হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটিতে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকেও আসামি করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের; সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানসহ শীর্ষ আসামিদের বিচার হবে পৃথকভাবে এবং তা হবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক।

অ্যাডভোকেট তাজুল বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে অতীতে যেভাবে বিচার হয়েছিল এখনো সেভাবেই হবে। অন্য মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা বেশি, সেগুলোর বিচারও চলবে।’ তিনি জানান, এক মামলার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে অন্য এক মামলাতেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

আসামি পলাতক থাকলেও রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী থাকবে

জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কোনো আসামি পলাতক থাকলেও তার পক্ষে স্টেট ডিফেন্স ল’ইয়ার বা রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী থাকবেন। আসামি কারাগারে থাকলে আসামিপক্ষ যে ধরনের আইনি শুনানির সুযোগ পান রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরাও প্রায় একই ধরনের শুনানির সুযোগ পাবেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর (প্রশাসন) গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পলাতক ঘোষণা করে শেখ হাসিনার বিচার হলে তার পক্ষে স্টেট ডিফেন্স ল’ইয়ার থাকবেন এবং তিনি আইনি শুনানির সব সুযোগই পাবেন।’

আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনে মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক সাড়া

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দ্রুত ও ত্বরান্বিত করার তাগিদ রয়েছে শহীদ পরিবারসহ বিভিন্ন মহলের। তবে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়নি। আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে মৌখিকভাবে তাগিদ দেওয়া হয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আরেকটি ট্রাইব্যুনাল হলে আওয়ামী লীগের সময়ের গুম, শাপলা চত্বরে হত্যার বিচারকাজ দ্রুত শুরু করা যাবে। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। মন্ত্রণালয় ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। আশা করি, আরেকটি ট্রাইব্যুনাল হবে।’