উগ্রপন্থা বিষয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বিভ্রান্তিকর

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘নতুন বাংলাদেশ গঠনের সুযোগ নিচ্ছে ইসলামি কট্টরপন্থিরা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর ও একপাক্ষিক। এতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক গতিশীলতাকে সরলভাবে দেখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

গত মঙ্গলবার প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ধর্মীয় চরমপন্থার কবলে পড়তে যাচ্ছে। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চরমপন্থি শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেননি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রেস উইং তার যাচাইকৃত ফেসবুক পেজ-সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টস-এ পোস্টে বিবৃতি দেয়। এদিকে অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের মতো কিছুই হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। গতকাল বুধবার ঈদের শুভেচ্ছা ও ঈদ পুনর্মিলনীর উদ্দেশে রাজধানীর বিভিন্ন থানা পরিদর্শন শেষে বাড্ডা থানায় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রেস উইং তার যাচাইকৃত ফেসবুক পেজ-সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টস-এ পোস্ট করা এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধটি বাংলাদেশের একটি বিভ্রান্তিকর ও একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে দেশটি ধর্মীয় চরমপন্থিদের নিয়ন্ত্রণের দ্বারপ্রান্তে।’ নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বাছাইকৃত কিছু ঘটনা তুলে ধরে ভ্রান্ত ধারণা ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রেস উইং ফ্যাক্ট ফেসবুক পেজে এক পোস্টে পয়েন্ট আকারে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বক্তব্যগুলোকে খ-ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জের বাস্তবতার উল্লেখ করে ওই পোস্টে বাংলাদেশে ধর্মীয় সহিংসতা সম্পর্কে বিভ্রান্তি, বাংলাদেশের বৈশ্বিক অগ্রগতির কথা উপস্থাপন করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের সমসাময়িক বিষয়গুলোকে একপাক্ষিক অতি সরলীকরণ করে বিচার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রেস উইং থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ নারীদের অবস্থার উন্নতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সুরক্ষা ও কল্যাণের জন্য বিশেষভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এটি এমন একটি সরকার যা নারীর অধিকার ও সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা নিবন্ধে তুলে ধরা আবছা চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ‘যুব উৎসব ২০২৫’, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ২৭ লাখ মেয়ে ৩ হাজার খেলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করেছিল। বিভিন্ন অঞ্চল, প্রান্তিক সম্প্রদায় এবং আদিবাসী যুব সমাজের ব্যাপক অংশগ্রহণ বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে নারী ও মেয়েদের স্বতঃস্ফূর্ত ও গতিশীল সম্পৃক্ততার প্রতিফলন।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘চরমপন্থি শক্তির বিরুদ্ধে যথেষ্ট কঠোরভাবে প্রতিরোধ করেননি’ এই দাবি শুধু মিথ্যাই নয়, বরং এটি নারীর ক্ষমতায়নের প্রতি তার আজীবন প্রতিশ্রুতিকেও উপেক্ষা করে বলে জানিয়েছেন প্রেস উইং।

ধর্মীয় সহিংসতা সম্পর্কে ভুল ধারণা সংশোধন : বাংলাদেশের মতো দেশে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ধর্মীয় সহিংসতার মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা চলে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘটিত অনেক সংঘর্ষকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যদিও বাস্তবে, সেগুলো মূলত রাজনৈতিক প্রকৃতির ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে রক্ষা করার জন্য তার প্রতিশ্রুতি সুস্পষ্ট করেছে উল্লেখ করে প্রেস উইং জানিয়েছেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চলমান কাজ এবং সন্ত্রাসবাদ দমন প্রচেষ্টা এই প্রতিশ্রুতিকে আরও জোরদার করে। সামাজিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে চরমপন্থা মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টা ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে মøান হওয়া উচিত নয়।

বৈশ্বিক মঞ্চে বাংলাদেশের ভূমিকা : বাংলাদেশ নীরবে এশিয়ার অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একটিতে রূপান্তরিত হচ্ছে, একটি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় যা বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রচুর সুযোগের প্রতিশ্রুতি দেয়। সব প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল হয়েছে, যা উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতার প্রতিফলন।

অতি সরলীকরণ এড়িয়ে চলা এবং একটি জাতিকে অপবাদ দেওয়া : নিউ ইয়র্ক টাইমসের নিবন্ধে কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেমন একজন নারীর ওপর নির্যাতনকারী একজন ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, যা একটি দেশের চরমপন্থায় পতিত হওয়ার চিত্র তুলে ধরে।

এটি শুধু বিভ্রান্তিকরই নয় বরং ক্ষতিকারক উল্লেখ করে প্রেস উইং জানিয়েছেন, ১৮ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে, কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দ্বারা সমগ্র দেশকে সংজ্ঞায়িত করা অযৌক্তিক। বাংলাদেশ একটি বৈচিত্র্যময় ও গতিশীল সমাজ, যেখানে সহনশীলতা, সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীল চিন্তাভাবনার সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। ধর্মীয় উগ্রবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ একা নয়; এটি একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা, যা অনেক দেশ বিভিন্ন রূপে মোকাবিলা করে। তবে আইন প্রয়োগ, সামাজিক সংস্কার ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য ক্রমাগত কাজ করে আসছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে চরমপন্থার উত্থান অনিবার্য এমন চিন্তা অত্যন্ত পূর্বধারণাপ্রসূত। দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও প্রাণবন্ত নাগরিক সমাজ এমন শক্তিশালী যা চরমপন্থি মতাদর্শের উত্থানকে প্রতিহত করে চলেছে। চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি গতিধারা শুধু চরমপন্থিদের কর্মকা- দ্বারা নির্ধারিত হবে না।

দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের মতো কিছুই হয়নি :অন্তর্র্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের মতো কিছুই হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ মন্তব্য করেন।

জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, কোথায় কী বলা হলো সেটা সম্পর্কে আমি কোনো কমেন্ট করতে চাচ্ছি না। তবে বাংলাদেশে কোনো ধরনের জঙ্গিবাদের কোনো উত্থান হচ্ছে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশে কোনো ধরনের জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেনি এবং এ ধরনের কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক, যা আরও উন্নতির অবকাশ রয়েছে। এটাকে আস্তে আস্তে আরও ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো ধরনের জঙ্গিবাদের কিছু দেখছেন? কোনো কিছুই হয়নি। আল্লাহ দিলে আপনারা যদি সবাই সহযোগিতা করেন, যদি কোনো ধরনের সমস্যা হয় আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে মোকাবিলা করব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোন পোস্টে কে কী বলল সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চান না।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে হত্যার দায়ে অনেক ক্ষেত্রে নিরীহ মানুষকে মামলা দেওয়া হচ্ছে, যাদের নাম এজাহারে নেই, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি সত্য। এমনও অনেকে আছেন যাদের এজাহারে নাম আছে কিন্তু জড়িত নয়। এমন অনেকেই ছিল যারা তখন দেশের বাইরে ছিলেন। এটা যাতে না হয় তাই সঠিকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। শুধু থানার তদন্ত নয় এর জন্য আলাদা কমিটিও করা হয়েছে। যেন কোনোভাবেই নিরীহ লোকজন সাজা না পায়। কোনোভাবেই কোনো দুষ্কৃতকারীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশে চরমপন্থা বা উগ্রপন্থার কোনো সুযোগ নেই : তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলম বলেছেন, বাংলাদেশে চরমপন্থা বা উগ্রপন্থার কোনো সুযোগ নেই। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আমাদের কাছে স্পষ্ট হচ্ছে যে তারা বলছে, বাংলাদেশের চরমপন্থা বা উগ্রপন্থার সুযোগ তৈরি হয়েছে, নতুন পরিস্থিতি এবং হাসিনা চলে যাওয়ার কারণে। তবে আমরা বলতে চাই, এমন কোনো সুযোগ কাউকে নিতে দেওয়া হবে না। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে অবস্থান হচ্ছে, এমন সুযোগ কাউকে নিতে দেওয়া হবে না। বাংলাদেশের যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে, সেটির সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখব। এরই মধ্যে আমরা ভূমিকা রেখেছিও বটে। ভবিষ্যতে আমরা চেষ্টা করব বাংলাদেশ কোনোভাবেই উগ্রপন্থি তৎপরতা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উগ্রপন্থা যেন মাথাচাড়া দিতে না পারে।

গতকাল কুমিল্লা নগরের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর রামপুর এলাকায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত মাছুম মিয়ার কবর জিয়ারত এবং তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা এ কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা যেন অপরাধীদের বিচার কার্যক্রম শেষ করে দিতে পারি, পুরোটা হয়তো শেষ করা সম্ভব নয়। তবে আমরা চেষ্টা করব প্রতিটি শহীদ পরিবার যেন বিচার পায়, সেটি নিশ্চিত করার। শহীদদের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে চেষ্টাগুলো চালিয়ে যাচ্ছে, আমরা মনে করি বাংলাদেশ দেশের জনগণ এটার সঙ্গে আছে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে, সদিচ্ছা প্রকাশ করে, তাহলে সবাই মিলে আমরা একটি বাংলাদেশে গড়তে পারব। পুরোটা শেষ করতে না পারলেও আমরা অন্তত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে যেতে পারব।