থানা থেকে লুট হওয়া নাইম এমএম পিস্তল ও শটগান দিয়েই চট্টগ্রাম নগরে জোড়া খুনের করেছে ‘খুনিরা’। হত্যায় অংশ নেয় ১৩ জন, ব্যবহৃত হয়েছে ছয়টি মোটরসাইকেল। এর মধ্যে তিনটি ছিল ব্যাকআপে। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে গত বুধবার রাতে গ্রেপ্তার হওয়া দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পেয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
বিষয়টি নিশ্চিত করে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম শুক্রবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জোড়া খুনের ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে— কিলিং মিশনে ছয়টি মোটরসাইকেলে অংশ নেয় ১৩ জন। তাদের মধ্যে অধিকাংশকেই আমরা শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। হত্যায় ব্যবহৃত হয়েছে থানা থেকে লুটের অস্ত্র ও গুলি। গত বছরের ৫ আগস্টে নগরের বিভিন্ন থানা থেকে এসব অস্ত্র লুট হয়েছিল।’
এর আগে গত বৃহস্পতিবার অভিযান চালিয়ে নগরের চান্দগাঁও খাজা রোড ও জেলার ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকা থেকে জোড়া খুনে জড়িত থাকার অভিযোগে মো. বেলাল (২৭) ও মো. মানিক (২৪) নামে দুজন ‘সন্ত্রাসীকে’ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে বেলাল ‘সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন’ এবং মানিক মোটরসাইকেল সরবরাহ করেছিলেন। বেলাল ও মানিক আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের অনুসারী বলে ভাষ্য পুলিশের।
নগরের বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেল হক বলেন, ‘গ্রেপ্তার দুজন এজাহারনামীয় আসামি না হলেও হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। সিসি ক্যামেরার ভিডিও, কল রেকর্ড পর্যালোচনা করে তাদের দুজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ঘটনার দিনের সংগ্রহ করা সিসি ক্যামেরার ভিডিওতে বেলালকে গুলি ছুঁড়তে দেখা গেছে। গুলি ছুঁড়ে সে একটি মোটরসাইকেলে উঠে চলে যান।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বেলাল ও মানিক মুখ খুলছেন না বলে জানিয়ে সিএমপির উপ-কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘জোড়া খুনে অংশ নেওয়া ১৩ জনের মধ্যে দুজন গ্রেপ্তার হয়েছে। আগামী রবিবার আদালত খুললেই তাদের রিমান্ডে আনার জন্য আবেদন করা হবে। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, থানা থেকে লুটের অস্ত্র ও গুলি দিয়েই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে খুনিরা। এ পর্যন্ত বেশকিছু তথ্য মিলেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তা প্রকাশ করা যাবে না। জোড়া খুন নিয়ে শিগগির একটা ইতিবাচক ফলাফল আসবে।’
চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের ঘটনায় গত মঙ্গলবার (২ এপ্রিল) দুপুরে নগরের বাকলিয়া থানায় মামলা করেছেন নিহত মোহাম্মদ মানিকের মা ফিরোজা বেগম। মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন (আগে থেকে গ্রেপ্তার আছেন) ও তার স্ত্রী তামান্না শারমিনসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। সাজ্জাদ ও তার স্ত্রীকে করা হয় হকুমের আসামি। জোড়া খুনের মামলার এজাহারে বলা হয়— দুই ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও সারোয়ার হোসেনের বিরোধের জের ধরে জোড়া খুনের ঘটনাটি ঘটেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করেন বাদী।
ছোট সাজ্জাদ গত ১৫ মার্চ রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি থেকে গ্রেপ্তার হয়ে দুটি খুনের মামলায় ১৪ দিন রিমান্ড শেষে বর্তমানে কারাগারে আছেন। আগামী রবিবার আদালত খুললেই সাজ্জাদকে আরও দশদিনের রিমান্ডে আনতে আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গত শনিবার (২৯ মার্চ) দিবাগত রাত ১২টার দিকে রূপালি রঙের একটি প্রাইভেট কার কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে বাকলিয়া অ্যাকসেস রোডে আসতে থাকে। গাড়িটি শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে কিছু দূর যাওয়ার পর পেছন থেকে তিন-চারটি মোটরসাইকেল সেটিকে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে এলোপাথাড়ি গুলি করতে থাকে। প্রাইভেটকারের ভেতর থেকেও মোটরসাইকেল আরোহীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। পেছন ও পাশ থেকে গুলি ছোড়া হয় গাড়িতে। গুলিতে অনেকটা ঝাঁজরা হয়ে যায় গাড়িটি। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাইভেট কারের দুই আরোহী নিহত হন। তারা হলেন- গাড়িচালক মোহাম্মদ মানিক ও আরোহী আবদুল্লাহ।
জোড়া খুনের ওই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া গাড়ির আরোহী রবিউল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, চান্দগাঁও এলাকার বাসিন্দা সারোয়ার হোসেনের ডাকে তারা অক্সিজেন থেকে নতুন ব্রিজ বালুর টাল এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে হামলার মুখে পড়েন। হামলাকারীদের চিনতে না পারলেও সম্প্রতি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেনের লোকজন এর সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করছেন রবিউল। তিনি আরও বলেন, সাজ্জাদের সঙ্গে সারোয়ারের সম্ভবত আগে থেকে দ্বন্দ্ব ছিল। সম্প্রতি সাজ্জাদের গ্রেপ্তার এবং এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝামেলা বেড়েছে। তাই সাজ্জাদের লোকজন সারোয়ারকে খুন করতে এ হামলা চালাতে পারে।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সারোয়ার হোসেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর জামিনে মুক্তি পান তিনি। তার বিরুদ্ধে ১৬টি হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ১৫ মার্চ ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া আকরাম নামের এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রাইভেট কারে গুলি করা হয়। আকরামের ব্যবহৃত গাড়ি ও এই গাড়ির রং একই। সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেওয়ার পর হুমকির ঘটনায় আকরামের স্ত্রী রুমা আক্তার বাদী হয়ে মামলা করেছিলেন। এতে সাজ্জাদের স্ত্রী, হাসানসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়।