স্পেস-এক্স ও টেসলার সিইও, নিউরালিংক ও ওপেন এআইর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক বিজ্ঞান, ব্যবসা ও আবিষ্কারের জগতে একের পর এক জাদু দেখিয়ে চলেছেন। তার উদ্ভাবনী ক্ষমতায় মুগ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি হঠাৎ করে সাফল্য পাননি। সেই ২০১২ সালের ১৫ জুন তিনি তার বিশ্বাস ও উপলব্ধির কথা বলেছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (ক্যালটেক) ১১৮তম বার্ষিক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। অনুপ্রেরণাদায়ী সে ভাষণটি বাংলায় ভাষান্তর করেছেন ফয়জুল ইসলাম রিংকু
আমার মনে হয়, আমি আজ এখানে কীভাবে পৌঁছলাম সেটি এখানে বলতে পারি এবং মনে হয় সেখানে শিক্ষণীয় কিছু আছে। আমি নিজেই অবাক হই, কীভাবে এগুলো হলো!
আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন জানতাম না, আমি বড় হয়ে কী করব? মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করত। কিন্তু আমার কাছে মনে হতো, নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার সত্যিই চমৎকার ব্যাপার। আমি এটা মনে করতাম, কারণ আমি আর্থার সি ক্লার্কের একটি কথা পড়েছিলাম। এটা ছিল, ‘অত্যন্ত অগ্রসর প্রযুক্তি আর জাদুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই’।
যদি আপনি তিনশ বছর পেছনে যান তাহলে আজ যেগুলোতে আমরা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি সেগুলো পাওয়া ছিল অকল্পনীয়। যেমন বাতাসে ভেসে
থাকা। অবিশ্বাস্য ব্যাপার। দূরের কোনো দৃশ্য দেখা, কথা বলতে পারা, পৃথিবীর সব তথ্য হাতের মুঠোয় পাওয়া। এই ব্যাপারগুলো সত্যিই অবিশ্বাস্য, অতীতে এগুলো জাদুর বিষয়ই ছিল।
আমার মনে হয় এটি তার থেকেও বেশি, কারণ এর মধ্যে অনেক জিনিসই অতীতে কল্পনা করা যেত না, এমনকি জাদুর সাহায্যেও। সে জন্য আমি চিন্তা করলাম, যদি আমি এমন কোনো অত্যন্ত অগ্রগামী কোনো প্রযুক্তি আবিষ্কার করতে পারি, যা কি না জাদুর মতোই, তাহলে সেটা একটা দারুণ ব্যাপার হবে।
আমাকে একটা বিষয় খুবই ভাবাত। মনে হতো, (আমাদের চারপাশের জগৎ) এসবের অর্থ কী? মানে, এসবের উদ্দেশ্য কী? এবং আমি এই উপসংহারে পৌঁছলাম যে, আমরা যদি আমাদের প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে সুযোগ প্রসারিত করতে পারি এবং সচেতনতার মাত্রা প্রসারিত করতে পারি তাহলে হয়তো আমরা শ্রেয়তর প্রশ্ন করতে পারব এবং আরও বেশি আলোকিত হতে পারব এবং এটিই এগিয়ে যাওয়ার উপায়।
সে কারণে আমি পদার্থবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করলাম যেহেতু আমি জানতে ও বুঝতে চাই, কীভাবে পৃথিবীটা চলছে আর কীভাবে অর্থনীতি কাজ করে। এর সঙ্গে এটিও জানতে হবে যে, কীভাবে কিছু তৈরির জন্য অনেক মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে হয়। কারণ অপর্যাপ্ত প্রযুক্তির সহায়তায় একা একা কোনো কাজ করা ভীষণ কঠিন।
আমি ক্যালিফোর্নিয়াতে এসেছিলাম এটা জানতে যে, ইলেকট্রিক যানবাহনের ভাগ্য কীভাবে উন্নততর করা যায়। সেটা ছিল ১৯৯৫ সালের কথা। তখন ইন্টারনেট আবির্ভূত হলো। তখন আমার সামনে দুটি পথ ছিল। এই (ইলেকট্রিক যানবাহন) প্রযুক্তিতে থাকা যেখানে সাফল্য নাও আসতে পারে অথবা ইন্টারনেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়া। আমি শিক্ষাজীবন থেকে বিরতি নিলাম। তখন আমি পেপাল শুরু করলাম। শুরুর চিন্তাটি ছিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি ছাতার নিচে আনা। আমাদের একটি ফিচার ছিল, যেটা ছিল ইমেইল পেমেন্টের মাধ্যমে। সেটি একটু জটিল হওয়ার কারণে কেউ আগ্রহী ছিল না। পরে আমরা আরেকটি পদ্ধতি বের করলাম, যেটিতে সবাই আগ্রহী হলো। এ থেকে আমরা জানলাম, কোনো কাজ যে আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী হবে তা নয়। বরং অন্যদের মতামত নিয়ে যদি পূর্ব ধারণা সংশোধন করে এগিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে সফলতা লাভ করা সম্ভব।
পেপালের পরে আমি ভাবতে থাকি, অন্য সমস্যাগুলো সমাধানের উপায় কী? অর্থ উপার্জন ভালো ব্যাপার কিন্তু এর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মানবসভ্যতাকে সবচেয়ে প্রভাবিত করতে পারে আমার কোন কাজ?
আমরা নির্দিষ্ট ও পার্থিব শক্তির ওপর নির্ভর করি। এই শক্তি অপর্যাপ্ততার সমস্যা যদি সমাধান না করতে পারি তাহলে আমরা গভীর সংকটে পড়ব। আরেকটি সংকট হলো, পৃথিবীকে ছাড়িয়ে অন্য কোনো গ্রহে বসতি স্থাপন।
আমি প্রথমে যখন স্পেস-এক্স শুরু করি, আমি ভালোভাবেই বুঝেছিলাম কেউ নিজে নিজেই একটি রকেট কোম্পানি শুরু করতে পারে না। আমি ভাবলাম, নাসার বরাদ্দ বৃদ্ধির উপায় কী? আমরা যদি একটা মঙ্গলগ্রহে অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারি তাহলে তাতে নিশ্চয়ই মানুষ আগ্রহী হবে এবং নাসার বরাদ্দ বৃদ্ধিতে তা যথেষ্ট হবে। এ ধরনের অভিযানে মুনাফার পরিমাণ শূন্য, কিন্তু এটি একটি বড় ধরনের উত্তরণ। আমি তিনবার রাশিয়ায় গিয়েছিলাম একটি ব্যবহৃত আইসিবিএম কেনার জন্য। ২০০১-২০০২ সালে রাশিয়ায় গিয়ে রকেট কেনা ব্যাপারটা আজবই বটে।
যখন আমি স্পেস-এক্সের কার্যক্রম শুরু করতে চাইলাম তখন একজন বন্ধু আমাকে বসিয়ে অনেকগুলো ভিডিও দেখাল, যেখানে রকেটগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি কারও উপদেশ শুনিনি। তবে এটা আমাদের জন্য একটু কঠিন ছিল, কারণ এখানে কৃতকার্য হতে শতভাগ সফলতা দরকার। প্রথম উড্ডয়ন ছিল দুঃখজনক। কিন্তু আমরা প্রতিটি উড্ডয়ন থেকেই কিছু না কিছু শিখছিলাম। চতুর্থ উড্ডয়নে আমরা অরবিটে পৌঁছতে সক্ষম হলাম। এ পর্যন্ত পৌঁছতে আমাদের সব অর্থ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তার পরে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আমরা মহাশূন্যে গমন ও সফলভাবে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছি।
টেসলা নিয়ে আমাদের আশা ছিল এটা দেখিয়ে দেবে যে, ইলেকট্রিক গাড়ি কী করতে পারে। মানুষের ধারণা ছিল, ইলেকট্রিক গাড়ি ধীরগতির এবং দেখতে আকর্ষণীয় নয়। এ কারণে আমরা টেসলা রোডসটার তৈরি করেছি এটা দেখাতে যে, ইলেকট্রিক গাড়িও দ্রুতগতির, আকর্ষণীয় ও দূরপাল্লার হতে পারে।
যদি আপনি একটি কোম্পানি তৈরি করতে চান তাহলে আগে একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করতে হবে। কারণ পাওয়ার পয়েন্টে সবই সম্ভব মনে হয়। কিন্তু আপনি যদি একটি ক্ষুদ্র কিন্তু বাস্তব সংস্করণ তৈরি করতে পারেন তাহলে সেটা আপনার কাজকে অন্যের কাছে আরও বিশ^াসযোগ্য করে তুলবে।
আমি যেটা এখানে বোঝানোর চেষ্টা করলাম তা হলো, আপনারা হলেন একবিংশ শতাব্দীর জাদুকর। কোনো কিছুকেই আপনাদের ধরে রাখতে দেবেন না। যা মানুষ কল্পনা করতে পারে, সেটিই হবে আপনাদের সীমানা। সেই কল্পনায় ছড়িয়ে পড়ুন আর জাদুর মতো কিছু তৈরি করুন। বড় চিন্তা করুন স্বপ্ন দেখুন তার চেয়েও বড়।
(ঈষৎ সংক্ষেপিত ও পরিমার্জিত)