দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সমাধান খোঁজার তাগিদ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক নিয়ে বিশ্বে টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দুনিয়ার প্রধান প্রধান শেয়ারবাজারে অব্যাহত পতন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশ্বমন্দার পূর্বাভাস দিয়েছে মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মর্গ্যান। ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের বিপরীতে চীন বিপরীত শুল্ক আরোপ করেছে। ১১টি মার্কিন কোম্পানির কার্যক্রমও স্থগিত করে দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সব দেশের পক্ষে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশ এ ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্বিপক্ষীয় আলোচনাই হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক জটিলতা নিরসনের প্রধান উপায়।

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। এ আমদানির বড় অংশই হচ্ছে তুলা, স্ক্র্যাপ আয়রন ও পেট্রোলিয়াম পণ্য। এ ছাড়া কিছু খাদ্যপণ্য আমদানি করা হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এর মধ্যে তুলা আমদানিতে কোনো শুল্ক নেই। আয়রন আমদানিতে শুল্ক ৪ শতাংশের মতো। আর পেট্রোলিয়ামে ৫ শতাংশ। খাদ্যপণ্যেও শুল্কের পরিমাণ কম। এর বাইরে আরও কিছু অপ্রচলিত পণ্য আমদানি করা হয়। যেগুলোতে শুল্ক বেশি। কিন্তু সেসব পণ্য পরিমাণে খুবই কম আমদানি করা হয়। আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে তুলা আমদানি করা হয়, তা দিয়ে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রেই রপ্তানি করা হয়। এমন ক্ষেত্রে কম শুল্ক ধার্যের বিধান যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান কাঠামোতেই রয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে ৭৪ শতাংশ শুল্ক ধার্য করে রেখেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে আমদানির ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ বিষয়টিকে ট্রাম্পের নিজস্ব বলে হিসেবে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক মহল। কারণ যে প্রক্রিয়ায় এটি হিসাব করা হয়েছে, তাতে বিষয়টিকে রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক না বলে বরং ট্রেড ডেফিসিট ট্যারিফ বা বাণিজ্য ঘাটতি শুল্ক বলা সঠিক হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ শুল্কহারের ভিত্তিতে নয়, বরং কোন দেশের সঙ্গে কত শতাংশ বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, তার ভিত্তিতে এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের এই শুল্কের বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে সরকার। এরই মধ্যে জরুরি সভা আহ্বান করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। আজ বাণিজ্য উপদেষ্টার দপ্তরও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। এ বিষয়ে মূলত সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। তাই এই দপ্তরগুলোকে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে কম শুল্ক থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি পণ্যের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বেশি শুল্ক দিতে হবে। এমন পরিস্থিতির সমাধানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কী করা উচিত, এমন প্রশ্নের জবাবে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদ্যমান বহুপক্ষীয় বাণিজ্যিক কাঠামো ভেঙে গেছে। কাজেই দ্বিপক্ষীয় ফোরামে আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান করতে হবে। দেশটির সঙ্গে যে পরবর্তী টিকফা আলোচনা হবে, সেখানে বিষয়টিকে জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে।’

এদিকে মার্কিন পণ্যের শুল্ক কমানোর উপায় খোঁজা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা ঘাটতি কমানোর সুযোগগুলো সক্রিয়ভাবে খতিয়ে দেখছি।’ শেখ বশির আরও জানান, এটি এখন আর দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, বরং বৈশি^ক অর্থনৈতিক সুনামি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুপক্ষীয় বাণিজ্যের যে বন্দোবস্ত রয়েছে, তা অকার্যকর হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মূল কাজ ছিল আপিল শুনানির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সৃষ্ট বাণিজ্য বিবাদ নিষ্পত্তি করা। কিন্তু কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সেই আপিল শুনানির ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে রয়েছে। এখন ট্রাম্পের এই শুল্ক আরোপের ফলে ডব্লিউটিওর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এর বিপরীতে দেশগুলো নিজেদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক বাণিজ্য নির্ধারণ করবে।

এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের কী করা উচিত, সে বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘ট্রাম্পের শুল্ক আরোপে ডব্লিউটিও অসহায়। এতে সংস্থাটির যে অক্ষমতা প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশ এবং উন্নত বিশ্বের যেসব দেশ আছে, তারাও নতুন করে চিন্তাভাবনা করবে কীভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্য কাঠামোতে সংস্কার আনা যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই শুল্কে বিশ্বের অনাস্থার বিষয়টিও আমরা দেখব।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেক দেশ ট্রাম্পের ঘোষণার পরই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা এমন কিছু করেননি। আমাদের শুল্ক-সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কতটা ভেবেছেন, জানি না। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের বড় দায়িত্ব আছে। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে এসব অতিরিক্ত শুল্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে আমরা কোথায় কোথায় কমাতে পারি। দ্বিতীয়ত, শুল্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের আলোচনা করতে হবে। “রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ” হিসেবে এখনো এক ধরনের ধোঁয়াশা আছে। সেগুলো পরিষ্কার হওয়া চাই। তৃতীয়ত, পোশাক শিল্পে অতিনির্ভরতা আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি আমরা বলে এলেও এখনো সে অর্থে কোনো উন্নতি নেই। পোশাকশিল্পের পাশাপাশি আমাদের রপ্তানির যেসব খাত আছে, সেখানে আমাদের জোর দিতে হবে। তাদের কোনো সমস্যা থাকলে তার সমাধান করতে হবে। আমাদের প্রতিযোগিতার জন্য অবকাঠামোগত ও দক্ষ শ্রমিক সমস্যার সমাধান করা দরকার।’

বাংলাদেশের সঙ্গে যেসব দেশ প্রতিযোগিতা করে, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, ইন্দোনেশিয়া এমনকি ভারত ও চীন, তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সস্তা শ্রম নয়। তাদের আছে অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমিক এবং সহায়ক নীতি। পাশাপাশি এ দেশগুলো মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করেছে। ভিয়েতনামের যেখানে ৫০টির ওপর চুক্তি আছে, সেখানে বাংলাদেশের আছে মাত্র একটি। তাও খুব ছোট করে ভুটানের সঙ্গে। তার মানে, অন্যান্য দেশ অনেক এগিয়ে। এমন একটা অনিশ্চয়তাপূর্ণ বিশ^বাজারে তারাই এগিয়ে থাকবে, যাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বেশি থাকবে। সেজন্য বাংলাদেশের সংস্কার জরুরি অবকাঠামো, নীতির ক্ষেত্র ও শুল্ক হ্রাসে। এগুলো খুব দ্রুত করতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।