বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে এক ভাইয়ের মৃত্যু অন্যজন গুলিবিদ্ধ

পটুয়াখালীর বাউফলে জুলাই আন্দোলনে যাত্রাবাড়ী এলাকায় মিছিলে গিয়ে গত ১৮ জুলাই আশিকুর রহমান হৃদয় (১৮) গুলিবিদ্ধ হন। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে অবশেষে গত ৪ এপ্রিল মাথায় বুলেট নিয়ে মারা যান তিনি। এদিকে মাথায় গুলিবিদ্ধ আছেন তারই আপন ভাই রেজাউল (২৯)। টাকা-পয়সার অভাবে সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না তার। তারা দুই ভাই উপজেলার সদর ইউনিয়নের জৌতা অলিপুরা গ্রামের আনসার হাওলাদারের ছেলে।

আহত রেজাউল জানান, তিনি পেশায় একজন অটোচালক। ভাড়ায় অটো চালাতেন যাত্রাবাড়ী এলাকায়। তার ছোট ভাই হৃদয় চাকরির সন্ধানে রেজাউলের কাছে থাকতেন। ১৮ জুলাই রাত ১১টার দিকে হঠাৎ একটা ফোন আসে রেজাউলের ফোনে। ওপাশ থেকে জানানো হয়, ‘আপনার ভাই হৃদয় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি।’ ছুটে যান সেখানে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল থেকে ভাইকে নিয়ে আসেন বাসায়।

আহত রেজাউল আরও জানান, মানুষের কাছে শুনেছেন হাসপাতালে রাখলে বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশন দিয়ে আহতদের মেরে ফেলা হয়। এমন ভয়ে ভাইকে আর চিকিৎসা করাননি হাসপাতালে। তাই ছোট ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে বাসায় অবস্থান করছিলেন রেজাউল। কিন্তু মহুর্মুহু গুলি আর বারুদের গন্ধে ঘর থেকে বের হতে পারছিলেন না তিনি। একদিকে ভাইয়ের চিকিৎসার টাকার জোগান, অন্যদিকে পেটের তাগিদ যেন ঘরে থাকতে বারণ করছিলেন রেজাউলের বিবেক। অটো চালাতে নেমে পড়েন রাস্তায়। ২১ জুলাই সকাল ১০টায় হঠাৎ পুলিশের ছোড়া তিনটি বুলেট আঘাত হানে রেজাউলের মাথায়। একই ভয়! হাসপাতালে গেলে যদি ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলা হয় তাকে? তাই তিনি বুলেট মাথায় নিয়ে হাসপাতালে না গিয়ে নিজ বাসায় আশ্রয় নেন। বাসায় বসে ব্লেড দিয়ে কেটে মাথার ভেতর থেকে দুটি বুলেট বের করা হলেও একটি থেকে যায়। ওই বুলেট নিয়ে এখনো আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন রেজাউল। কিন্তু তার ভাই হৃদয়কে আর বাঁচানো যায়নি।

হৃদয়ের মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে রেজাউল বলেন, যাত্রাবাড়ী এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন হৃদয়। তার মাথা, বুক ও হাতে একাধিক বুলেট আঘাত হানে। অনেকগুলো বুলেট অপসারণ করা গেলেও একটি বুলেট মাথার খুলিতে ঢুকে গিয়েছিল। সেটা থেকে যায় তার মাথায়। তার বাবাও পেশায় একজন অটোচালক। ছেলে হৃদয়ের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে হালের গরু এবং নিজের কামাইয়ের একমাত্র অবলম্বন অটোরিকশা বিক্রি করে ছেলের চিকিৎসা করান। সর্বস্বান্ত হয়েও নিজের আদরের ছোট ছেলে হৃদয়কে বাঁচাতে পারল না তার পরিবার। এবার অন্য ছেলে রেজাউলকে চিকিৎসা করাবেন কী দিয়ে এমন প্রশ্নের জবাব নেই কারও কাছে। জুলাই ফাউন্ডেশনসহ অনেকের দ্বারস্থ হয়েছেন গোপনে। কিন্তু কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি।

নিহত হৃদয় ও আহত রেজাউলের বাবা আনসার হাওলাদার বলেন, ‘৫ আগস্টের পর একটি অটোরিকশা ও একটি গরু বিক্রি করে চিকিৎসার জন্য হৃদয়কে ঢাকা নিয়ে গিয়েছি। হৃদয়ের মাথার গুলিটি বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় তাকে চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল। আমাদের কাছে অত টাকা ছিল না। হৃদয় মারা যাওয়ার পর অনেক লোক এসেছে, কিন্তু বেঁচে থাকতে কেউ সহযোগিতা করেননি।’

গত রবিবার দুপুর ১টার দিকে হৃদয়ের পরিবারের খোঁজখবর নিতে গ্রামের বাড়িতে পরিদর্শনে আসেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মাদ আরেফীন। এ সময় বাউফল উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক কুমার কু-ু ও বাউফল থানার ওসি কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন। একই দিন সৌজন্য সাক্ষাতে আসেন উপজেলা বিএনপির (মু. মুনির হোসেন সমর্থিত) আহ্বায়ক আ. জব্বার মৃধা, সদস্য সচিব আপেল মাহমুদ ফিরোজসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী।

এ সময় জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মাদ আরেফীন বলেন, ‘তারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত ছিল, সেটা উপজেলা প্রশাসন বা জেলা প্রশাসন কাউকেই কখনো জানাননি। মৃত্যুর পর আমরা জানতে পারলাম। খবর পেয়ে আমরা তার বাড়িতে এলাম। তাৎক্ষণিক একটি অটোরিকশা কিনে দেওয়া হয়েছে। এই পরিবারে অন্য এক সদস্য মৃত হৃদয়ের ভাই রেজাউল মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আছেন। আমি তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। শিগগিরই রেজাউলের অপারেশন করে বুলেটটি বের করা হবে এবং তাদের পরিবারের নাম জুলাই আন্দোলনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’