দর্শকদের চোখ থাকে মাঠের দিকে—চমৎকার গোল, অবিশ্বাস্য সেভ কিংবা চোখ ধাঁধানো স্কিল। কিন্তু মাঠের পাশে, টাচলাইনের গা ঘেঁষে চলতে থাকে এক অনন্য নাটক—কোচের আচরণ, অভিব্যক্তি আর রণকৌশল।
সম্প্রতি এক বিশেষ প্রয়াসে প্রিমিয়ার লিগের ১০টি ম্যাচ ঘুরে সব কোচের কার্যকলাপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে বিবিসি স্পোর্টস। দেখা গেছে, খেলার সময় কোচরা ঠিক কতটা আবেগপ্রবণ হন, কীভাবে চাপ সামলান এবং কিভাবে প্রভাব ফেলেন তাদের দলের পারফরম্যান্সে।
টেকনিক্যাল এরিয়ার বাইরে বারবার…
‘ল’ অনুযায়ী কোচদের টেকনিক্যাল এরিয়ার ভেতরেই থাকার কথা। তবে বাস্তবে চিত্রটা একটু ভিন্ন। উইকএন্ডের ম্যাচগুলোতে গড় হিসেবে কোচরা প্রায় এক-চতুর্থাংশ সময় কাটিয়েছেন এরিয়ার বাইরে। ড. গিলিয়ান কুক, লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির স্পোর্টস সাইকোলজির অধ্যাপক বলছেন, 'খেলোয়াড়েরা কোচকে দেখলে ও শুনলে মনোযোগ বাড়ে। কোচের চোখের ইশারা, মাথা ছুঁয়ে ‘ফোকাস’ বোঝানো—এসব খেলোয়াড়ের মনস্তত্ত্বে সরাসরি প্রভাব ফেলে।'
আলাদা হয়ে ভাবা, চাপ সামলানোর কৌশল
ডাগআউটে কোচিং স্টাফ, বিকল্প খেলোয়াড় আর বিভিন্ন মতামতের ভিড়ে মানসিক চাপের মাত্রাও থাকে তুঙ্গে। তাই মাঝে মাঝে টেকনিক্যাল এরিয়া থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে একা থাকাই হয়ে ওঠে আবেগ নিয়ন্ত্রণের পথ। সাবেক লেস্টার বস নাইজেল পিয়ারসন বলেন, 'অনেক সময় নিজেকে একটু সরিয়ে নেওয়া দরকার হয়, যেন মাথা ঠান্ডা করে ভাবা যায়।'
আচরণেই অনুপ্রেরণা
প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও খেলোয়াড়দের সাহস ও স্থিরতা জোগাতে কোচের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারও অভিব্যক্তি উত্তেজনাময়, কেউ আবার স্থিরতা ছড়িয়ে দিতে চান। যেমন ব্রাইটনের কোচ ফাবিয়ান হারজেলার—৩টি লাল কার্ডের ম্যাচে দলের পিছিয়ে পড়ার সময়ও তিনি ছিলেন চুপচাপ। মনস্তত্ত্বের ভাষায়, একে বলা হয় ‘ইমোশনাল লেবার’—নিজের অনুভূতি লুকিয়ে বাহ্যিকভাবে একটা কাঙ্ক্ষিত ভাবমূর্তি ধরে রাখা।
একাই মঞ্চে নাকি সহযোগিতায় শক্তি?
কেউ কেউ সহকারী কোচদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক আলোচনা করেন, যেমন ব্রেন্টফোর্ডের থমাস ফ্রাঙ্ক। আবার চেলসির এনজো ম্যারেস্কা নিজের মতোই পরিচালনা করেন দল। পিয়ারসনের মতে, 'খেলোয়াড়দের ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতা বুঝে সহকর্মীদের দিয়ে বার্তা পৌঁছে দেওয়া অনেক সময় কার্যকর হয়।'
রেফারিদের সঙ্গে খেলা—ভরসা নাকি বিভ্রান্তি?
রেফারিদের সঙ্গে কোচদের বিরোধ নতুন কিছু নয়। রেফারির সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ কোচদের প্রতিক্রিয়া মাঠের খেলোয়াড়দের মনোযোগেও প্রভাব ফেলে। ড. কুকের মতে, 'ম্যাচের সময় কোচের উত্তেজনা দেখে খেলোয়াড়ের মানসিক ভারসাম্যও নড়বড়ে হতে পারে।'
ভিন্ন ভিন্ন স্টাইল, একই লক্ষ্য—আত্মবিশ্বাস ছড়ানো
ভিএআর সিদ্ধান্তের সময় স্পার্স কোচ আনজে পোস্টেকগলু যেন সেই নাটকীয়তার চূড়ান্ত প্রকাশ। চার মিনিটের অপেক্ষায় তিনি শুরু করলেন ‘রক-পেপার-সিজরস’ খেলাটি—নিজেকে সামলানোর অভিনব উপায়।
কী পরলেন কোচ? স্যুট নাকি ট্র্যাকসুট?
পরিচ্ছদের মধ্যেও লুকিয়ে আছে বার্তা। কেউ চান কর্তৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠতে, কেউ আবার খেলোয়াড়দের মতোই মিলিয়ে যেতে। গবেষণায় দেখা গেছে, স্যুটে থাকলে শক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে, আবার ট্র্যাকসুটে দেখা যায় খেলাধুলার গভীর জ্ঞান।
সবশেষে—আসল রহস্য ‘আসল’ থাকা
সব গবেষণা, বিশ্লেষণ আর পরিসংখ্যান শেষে একটাই কথা উঠে আসে—আসল শক্তি ‘আসল’ বা অথেন্টিক থাকায়। ড. কুক বলেন, 'যখন খেলোয়াড়রা বুঝবে কোচ ঠিক যেমন অনুশীলনে থাকেন, তেমনই ম্যাচেও—তখনই তৈরি হবে বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসই পারফরম্যান্সে বদলে যাবে সাফল্যে।'
আর তাই, মাঠের বাইরের নাট্যশালায় দাঁড়িয়ে একজন কোচ—মাঝে মাঝে নায়ক, কখনো কুশীলব—তবুও সাফল্যের পেছনে তার প্রভাব, নিঃসন্দেহে অপরিসীম।