জমি-জায়গা নিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে ‘সংকটে’ পড়েননি বা ‘জিম্মি’ হতে হয়নি এমন কাউকে পাওয়া বিরল। বিশেষ করে অর্থনৈতিক হয়রানির শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। উপজেলা পর্যায়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বড় কর্তা সাব-রেজিস্ট্রার। বর্তমানে নবম গ্রেডে বেতন পান তারা। অথচ ব্যতিক্রম ছাড়া কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক তারা। চাকরি করেন উপজেলায়, কিন্তু অট্টালিকা তুলেছেন জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরে। রাজধানীতে ফ্ল্যাট। ছেলেমেয়েদের পড়ান বিদেশে। কীভাবে সম্ভব? একজন সাব-রেজিস্ট্রার বেতন পান ন্যূনতম ২২ হাজার থেকে ৫৩ হাজার ৬০ টাকা।
এক জমির বহুবার মালিক বদল হয়। কেনা সূত্রে; উত্তরাধিকার সূত্রে; দান সূত্রে বদল হয় জমির দলিল। এই বদল করতে টাকায় টাকায় পার হতে হয় ‘ঘুষের ঘাট’। ধরা যাক; গ্রামের এক নিম্ন আয়ের মানুষ রেজিস্ট্রি অফিসে গেলেন। এরপর তার সামনে ভয়ংকর পিয়ন, উমেদার, নকলনবিশ সর্বোপরি সাব-রেজিস্ট্রার। কীভাবে একজন সাব-রেজিস্ট্রার কোটি কোটি টাকার মালিক?
ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার কামরুল হাসান। তিনি ৩৩০ টাকার নকল তুলতে নেন ৪ হাজার টাকা। সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত নেন প্রায় ১২ গুণ। হেবা দলিল সম্পাদনা ফি মাত্র ১ হাজার ২৩০ টাকা। এর বদলে তিনি নেন ৬০ হাজার টাকা। অভিযোগ রয়েছে, শতাংশের হিসাব কষে ঘুষ নেন তিনি। না দিলে কাজ তো হবেই না, উল্টো দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে। অবশেষে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়েই ফিরতে হবে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) প্রতিনিয়ত সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতি-সংক্রান্ত অভিযোগ জমা পড়ছে। এসব অভিযোগের কোনোটি প্রাথমিক অনুসন্ধানে সত্যতা পেলে আবার কোনোটি এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের অভিযানে সত্যতা মিললে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান করছে সংস্থাটি।
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ফরিদপুর সদরের সাব-রেজিস্ট্রার কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষগ্রহণ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের সত্যতা পাওয়ায় সম্প্রতি অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা ও ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার থাকাকালে ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের ও স্ত্রী-সন্তানের নামে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল আবাসিক শহর প্রকল্পে ২০ কাঠা আয়তনের প্লট কেনাসহ ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সম্পদের মালিকানা অর্জন করেছেন।
দুদকের তথ্যমতে, গত বছরের অক্টোবর মাসে ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষবাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ে দুদকে। কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নুর আলম সিদ্দিকীকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেন।
তিনি অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে গত ২ মার্চ দেশের সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক, বীমা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, রাজউক, সিটি করপোরেশন, ভূমি অফিস, রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন অফিস চিঠি পাঠায়। চিঠিতে ১৩ মার্চের মধ্যে কামরুল হাসান, তার স্ত্রী শিওন ঝিলিক ও দুই সন্তানের নামে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য দুদকে পাঠাতে বলা হয়। ওই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন দপ্তর থেকে রেকর্ডপত্র দুদকে পাঠানো শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সাব-রেজিস্ট্রার কামরুল হাসান ২০১০ সালে নবম গ্রেডের একজন কর্মকর্তা হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। তিনি বর্তমানে মাসে ৬০-৭০ হাজার টাকা বেতন পান। তার এই চাকরি ছাড়া আর কোনো আয়ের উৎস নেই। অথচ ফরিদপুরে একটি বাড়ি ও প্লট, ঢাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে ২০ কাঠা আয়তনের প্লট কেনার অভিযোগ রয়েছে।
রাজউকের একজন সহকারী পরিচালক বলেন, রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে প্রতি কাঠা জমি ১ কোটি টাকার বেশি মূল্যে বিক্রি হয়। সেই হিসাবে ২০ কাঠা জমি কেনা হলে তার মূল্য ২০ থেকে ২২ কোটি টাকা হবে।
দুদকের কাছে অভিযোগে বলা হয়, ফরিদপুরের সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মধ্যে সরকার নির্ধারিত ফি আদায়ের তালিকা টানানো থাকলেও তা মানা হয় না। তালিকায় বিভিন্ন প্রকৃতির দলিলের মধ্যে সাফ-কবলা, হেবা ঘোষণাপত্র, দানপত্র ও বন্ধকী দলিল সম্পাদনের জন্য পৃথক ফি উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেশকার, মুহুরি বা সংশ্লিষ্টদের সিন্ডিকেট সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত টাকা নিয়ে দলিল সম্পাদন করতে বাধ্য করে। প্রতিটি দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে দলিলে উল্লিখিত জমির মূল্যের ওপর ১ শতাংশ টাকা অফিসকে দিতেই হয়। এই ১ শতাংশ টাকা অফিসকে না দিলে দলিল সম্পাদন হয় না। এ ছাড়া অফিসের মুহুরি ও অন্যান্য কর্মচারীর জন্য আলাদা খরচ দিতে হয়। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে সাধারণ মানুষ যেন জিম্মি।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কামরুল হাসান ২০২৪ সালে ফরিদপুর চরভদ্রাসন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে তাকে ফরিদপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। রোজার আগে তাকে ফরিদপুর থেকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। ফরিদপুর ও চরভদ্রাসন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি-জমার দলিল সম্পাদনে দীর্ঘদিন ধরে ফির নামে বাড়তি টাকা আদায় করা হয়। নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে কোনো কাজ হতো না। জমি রেজিস্ট্রিকালে যে পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়, তার একটি অংশ পেতেন সাব-রেজিস্ট্রার। কামরুল হাসান দায়িত্ব পালনকালে একই কায়দায় অর্জিত অর্থ আদায় করে নিজের ও স্ত্রী-সন্তানের নামে বাড়ি-গাড়িসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ কেনেন।
অভিযোগ রয়েছে, ২০ লাখ টাকা মূল্যের জমির দলিল সম্পাদনের জন্য ৭৫ হাজার টাকা সরকারি ফি আদায়ের বিধান রয়েছে। কিন্তু উপজেলার কেএম ডাঙ্গী গ্রামের আক্কাস আলীর কাছ থেকে সরকারি ফি বাবদ একজন মুহুরি নেন ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এ ছাড়া অফিস ও অন্যান্য খরচ বাবদ আরও ২০ হাজার টাকা নেন। সব মিলিয়ে তার কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নেওয়া হয়, যা সরকারি ফি থেকে দ্বিগুণের বেশি।
অভিযোগে বলা হয়, প্রতিটি হেবা-ঘোষণাপত্র দলিল রেজিস্ট্রির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে ১ হাজার ২৩০ টাকা। কিন্তু ৫০ লাখ টাকা মূল্যমানের হেবা-ঘোষণাপত্র দলিল সম্পাদনের জন্য অফিসে গিয়ে একজন জমি ক্রেতার কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয় অন্তত ৬০ হাজার টাকা।
অভিযোগে আরও বলা হয়, একটি সাফ-কবলা দলিল সম্পাদনের জন্য সরকারি ফি হচ্ছে জমির মোট মূল্যের ওপর প্রতি লাখে সাড়ে ৭ হাজার টাকা। কিন্তু সেখানে নেওয়া হয় লাখে প্রায় ১০ হাজার টাকা। আবার অফিসকে দিতে হয় জমির মোট মূল্যের ওপর আরও ১ শতাংশ। এতে সাধারণ মানুষকে মোটা অঙ্কের অর্থ গচ্চা দিতে হয়।
অভিযোগে বলা হয়, দানপত্র দলিল সম্পাদনের জন্য ২ শতাংশ উৎস কর নেওয়ার কোনো বিধান নেই। জমি ক্রেতা শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মুহুরি ২ শতাংশ উৎসে করের টাকা নেন। এ ছাড়া অফিস খরচ বাবদ অতিরিক্ত আরও ১ শতাংশ টাকা নেন। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে বিভিন্ন আইনি জটিলতা দেখিয়ে দলিল সম্পাদন বন্ধ রাখার হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের একটি নকল ওঠাতে সরকারি ৩৩০ টাকা ফির স্থলে জমি ক্রেতাদের কাছ থেকে ৩-৪ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাব-রেজিস্ট্রার কামরুল হাসানের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তিনি রিসিভ করেননি।