তিস্তা নিয়ে ভারত-চীনের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ থাকবে

অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারত ও চীন উভয়ের সঙ্গেই কাজ করা সম্ভব। গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিস্তা প্রকল্প নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ঝট করে কোনো কিছু প্রত্যাশা করছি না যে, কালকেই কেউ তিস্তা সমস্যার সমাধান করে দেবে। চীনের সঙ্গে আমাদের একটি আমব্রেলা চুক্তি আছে নদীর পানি নিয়ে। নদীর পানি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সবার জন্য এবং আমাদের জন্য বিশেষ করে। আমরা ওপেন আছি। ভারতের সঙ্গেও সহযোগিতা সম্ভব, চীনের সঙ্গেও সম্ভব। কোনোটাতেই বাধা নেই। আমরা দেখব যে কোন প্রজেক্টে কোথা থেকে সহায়তা নিলে আমাদের সুবিধা হবে। সে অনুযায়ী ওয়াটার রিসোর্স মিনিস্ট্রি কাজ করবে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের সময়ে তিস্তা প্রকল্পে চীনা কোম্পানির অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায় সরকার। তবে সরকার এ বিষয়ে উদারনীতি গ্রহণ করেছে এবং এ প্রকল্প নিয়ে ভারত বা চীনÑ উভয়ের সঙ্গেই আলোচনা করার সুযোগ থাকবে।

আসছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা : চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ সফরে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের দুই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। দুজন আলাদাভাবে আসবেন এবং পৃথক দুটি দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে জানিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, মার্কিন কর্মকর্তাদের এ সফরে বাংলাদেশের সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণে সহায়তা, মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা সংকটসহ ঢাকা-ওয়াশিংটন সম্পর্কের নানা বিষয়ে আলোচনা হবে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, আগামী সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক এবং পূর্ব এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয়বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি নিকোল অ্যান চুলিক ও অ্যান্ড্রু আর হেরাপ ঢাকা সফর করবেন। একই সময়ে ঢাকায় আসার কথা রয়েছে মিয়ানমারে নিযুক্ত মার্কিন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত সুসান স্টিভেনসনেরও।

ঢাকা আসছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, চলতি মাসে ঢাকা সফরে আসছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এবং পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর চূড়ান্ত এবং চলতি সপ্তাহের মধ্যে তারিখও ঠিক হবে। তৌহিদ হোসেন বলেন, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর মোটামুটি প্রায় নিশ্চিত। তিনি যে আসবেন এটা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তবে তারিখটা নিয়ে একটু ফ্লুইড আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, আগামী দুই থেকে এক দিনের মধ্যে আমরা এটা চূড়ান্ত করে ফেলতে পারব। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে কোন বিষয়গুলো আলোচনা হবে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তিনি যেহেতু সফরে আসছেন, আলোচনা করার জন্যই আসছেন। আমাদের সম্পর্কের সব দিক নিয়ে আলোচনা করব।

জানা গেছে, আগামী সপ্তাহের শেষের দিকে ঢাকা সফরে আসবেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ। ১৭ এপ্রিল ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র সচিব আমনা বালুচ বৈঠকে নিজ নিজ দেশের নেতৃত্ব দেবেন। এর পরবর্তী সপ্তাহে ঢাকায় আসবেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। তিনি পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।

মোদি বলেছেন সম্পর্ক বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে, কোনো দলের সঙ্গে নয় : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি দিল্লির কাছে উত্থাপন করেছে ঢাকা। তবে এটা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কিছু হয়নি। এ ছাড়া ভারতের শীর্ষপর্যায় থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দল বিবেচনা করে না দিল্লি। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করার কথা উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে ভারতের উত্তর জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে চূড়ান্ত কিছু হয়নি, আমি এটুকুই বলব। তৌহিদ হোসেন বলেন, এটা নিয়ে চূড়ান্ত কোনো কথাবার্তা হয়নি, কাজেই আমরা এটাকে এখানেই রাখি। আমরা তো তাদের কাছে ফেরত চেয়েছি, বলেছি তাকে বিচারের সম্মুখীন করা হোক। সম্পর্কে অস্বস্তি যেন না হয়, সেজন্য উত্তেজনাকর পরিস্থিতি থেকে বিরত থাকতে বার্তা দিয়েছে ভারত। এ প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, এটা নিয়ে আমরা নিজেরাও একমত। এটা যে একতরফাভাবে হচ্ছে তা তো নয়। একই কাজ ভারত থেকেও হয়ে থাকে। আমরা জানি যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রতিদিনই শক্ত শক্ত কথা শোনা যাচ্ছে, এমনকি কেন্দ্রীয় সরকারের কেউ কেউ এটা করেছেন। আমরা এটা বলেছি, সম্পর্ক উন্নয়ন করতে গেলে আপত্তিকর কথাবার্তা না বলাই ভালো। আমরা এটাকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছি।

ব্যাংককে ইউনূস-মোদি বৈঠক আন্তরিক পরিবেশে হয়েছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, সাক্ষাৎ ইতিবাচক পরিবেশে হয়েছে এবং দুপক্ষই আসলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ভালো রাখার এবং ভালো করার ওপর জোর দিয়েছে। মোদি স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক দেশের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে; এটা কোনো দলের সঙ্গে নয়। উনি এটা স্পষ্ট করেছেন। এটাকে আমরা একটা ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখতে চাই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরবর্তী পদক্ষেপ কী জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, সময় লাগবে। মাত্রই বৈঠকটা করলাম।

ইতালির পেন্ডিং ও ভারতীয় ভিসা নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা : ইতালি যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মী যাদের ভিসা অপেক্ষমাণ (পেন্ডিং) আছে, সেটির সমাধান ইতালির হাতে। আর এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইতালিকে অবিরাম চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ইতালির বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত তাদের সঙ্গে যোগাযোগে আছি। কিছু সমস্যা আছে যেটাতে আমাদেরও দোষ আছে। নিজেদের ত্রুটি, স্বীকার করা উচিত। কারণ, ৬০ হাজার মানুষের কাগজপত্র ইস্যু হয়েছে; সেই কাগজপত্রে অনেক ক্ষেত্রে ভিত্তি সঠিক নয় বলে আমরাও জানি, ইতালিয়ানরাও সেটাকে চিহ্নিত করেছে। তিনি আরও বলেন, তারা আমাদের বলেছে, এগুলো চেকআপ না করে দিতে পারবে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের কাগজপত্র নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশ থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়। আর তাদের সন্দেহ অমূলক নয়।

ইতালি যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি কর্মীদের উদ্দেশে তৌহিদ হোসেন বলেন, আমার সহানুভূতি আছে যারা সাফার করছে। আমি নিশ্চিত তাদের মধ্যে অনেক সঠিক মানুষ আছে। কিন্তু যেটা হয়, সঠিকের সঙ্গে বেঠিক ঢুকে যায় তখন সব চেকআপ করতে হয়। আর এতে করে সঠিক যারা তাদের সাফার করতে হয়, সেটাই ঘটছে এখানে। এখন তারা যদি আন্দোলন করে তাহলে এর মাধ্যমে সমাধান হবে না। এ সমস্যার সমাধান ইতালিয়ানদের হাতে এবং আমরা তাদের অবিরাম চাপ দিয়ে যাচ্ছি।

সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক করার বিষয়ে যে কোনো অগ্রগতি হয়নি, তারই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে। তিনি বলেন, প্রকৃতিতে কোনো ভ্যাকুয়াম থাকে না। এখানে ভিসার অভাবে লোকজন না যেতে পারলে তারা অন্য কোথাও যাবে। যাচ্ছে ইতিমধ্যে, আমরা সেটাতে সহায়তা করব যেন লোকজনের সমস্যা না হয়। কারণ, আমাদের লোকজন যে যে কারণে ভারতে যেত সেটা যদি অন্য কোনো দেশে সমাধান করা যায়, আমরা সমাধানের চেষ্টা করব। ভারত যদি ভিসা দেয় সেটা তাদেরও স্বার্থ উদ্ধার হবে, আমাদেরও হবে। আমরা জানি ভিসা না দেওয়ার কারণে কলকাতায় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উপদেষ্টা আরও বলেন, ভিসা হচ্ছে একটা দেশের সম্পূর্ণ স্বাধীন অধিকার। এ নিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আপনি তাদের বলতে পারবেন না, কেন দিচ্ছেন না।

১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত : বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের জন্য যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। তবে রাখাইনের যে অবস্থা তাতে করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, আমরা চেয়েছি তাদের মুখ থেকে কথা আসুক। তারা স্পষ্ট করেছে, আড়াই লাখের মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার ক্লিয়ার করেছে এবং বাকি ৭০ হাজারকে রিভিউ করছে। আমরা সেই সঙ্গে তাদের কাছে দাবি জানিয়েছি, আরও ৭-৮ লাখ যেটা আছে সেটা যেন তারা ত্বরান্বিত করে। এ তালিকা অ্যাপ্রুভ করা মানে এই নয় যে, কালকে তারা চলে যেতে পারবে।