পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। এবারের আয়োজন ঘিরে শুরু থেকেই চলছে বেশ আলোচনা ও সমালোচনা। এদিকে নতুন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি পরিবর্তন করে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’, ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ অন্য কোনো নাম করার গুঞ্জন উঠেছে। এদিকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিদ্ধান্ত নেবে বলেও জানিয়েছেন। ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের পর প্রথম নববর্ষ পালনে শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের সম্ভাবনা প্রবল। যদিও বিষয়টি নিশ্চিত করেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। চারুকলার রীতি অনুযায়ী, শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল ২৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের। কিন্তু তারা আয়োজনে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ তুলে এবারের বৈশাখী উৎসব বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। তারা বলছেন, এ আয়োজন দেশের পরিবর্তনকালীন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২৬তম ব্যাচ এখন ‘সাবেক’ শিক্ষার্থী। চলমান শিক্ষার্থীরা এ নিয়ে কাজ করছেন। চারুকলায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁশ-বেতের কারুকাজে তৈরি হচ্ছে এক দৈত্যাকৃতির ‘ফ্যাসিবাদী প্রতিকৃতি’, যার উচ্চতা হবে প্রায় ২০ ফুট। যেখানে সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মুখাবয়বের দুপাশে থাকবে শিংয়ের মতো অবয়ব। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এটি এবারের শোভাযাত্রার প্রধান মোটিভ বা অবকাঠামো হিসেবে থাকছে। এ ছাড়া লোকজ মোটিভের কাঠের বাঘ, শান্তির প্রতীক কবুতর, পালকি ও বিশালাকৃতির ইলিশ মাছও থাকছে শোভাযাত্রায়।
তাছাড়া গেল বছরের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে তৈরি করা হচ্ছে মীর মুগ্ধের আলোচিত ‘পানি লাগবে’-এর ১৫ ফুট উচ্চতার একটি পানির বোতল। এর ভেতরে থাকবে একাধিক খালি বোতল, যা শহীদদের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হবে।
‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে এবার পালিত হবে বাংলা নববর্ষ উদযাপন। আনন্দ আর প্রতিবাদের মিলনমেলায় নতুন বছরকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত বাংলার মানুষ। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক আয়োজন আর সচেতনতার বার্তায় মুখর হবে পহেলা বৈশাখের দিনটি। তবে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করা হবে কি না, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ১০ এপ্রিল এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানা গেছে। সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কমিটিগুলো কাজ করছে। পাঁচটি উপকমিটি হয়েছে। ৯টি ওয়ার্কিং কমিটিও কাজ করছে পুরোদমে। ১০ এপ্রিলের আগেই নাম পরিবর্তন হবে কি না, পরিবর্তন হলেও তার নাম কী হবে; তা নিয়ে আলোচনা চলমান।
গতকাল মঙ্গলবার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেবে। ১০ এপ্রিল এ বিষয়ে একটি বৈঠক হবে, যেখানে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।’
মঙ্গল শোভাযাত্রার নামের পরিবর্তন ও সর্বজনীন কোনো নাম দেওয়ার বিষয়ে কথা বলছেন অনেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী বলেন, আনন্দ শোভাযাত্রা বা বৈশাখী শোভাযাত্রা বলা ভালো। মঙ্গল শোভাযাত্রাকে সঠিক মনে হয় না। মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটিকে সর্বজনীন করতে হলে নামটা অবশ্যই পরিবর্তন করা উচিত। একজন সাধারণ মানুষকে যদি বলা হয় আমি আনন্দ শোভাযাত্রায় বা বৈশাখী শোভাযাত্রায় যাচ্ছি, তাহলে সেটি সহজেই বুঝবে। কিন্তু তাকে যদি বলা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রায়’ যাচ্ছি, তাহলে সেটি সেভাবে বুঝতে পারবে না।
চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম চঞ্চল দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখনো নাম নির্ধারণ করা হয়নি। এবার যেহেতু বৃহত্তর পরিসরে ইনক্লুসিভ প্রোগ্রাম হবে সেজন্য আমরা এ নিয়ে আলোচনা করছি। আমরা দু-এক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিকদের জানাব।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ধারাবাহিকভাবে যেটি চলে এসেছে সেটি থাকতে পারে। তবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় চাইলে বাঙালির ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ঠিক রেখে নামের পরিবর্তন করতেও পারে।
এদিকে চৈত্রসংক্রান্তির দিন অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চারুকলার বকুলতলায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও যাত্রাপালার মঞ্চায়ন। আর নববর্ষের দিন সকালেই বের হবে সেই আলোচিত শোভাযাত্রা, যেখানে তুলে ধরা হবে বাংলার লোকজ ঐতিহ্য এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী বার্তা।
আশির দশকে সামরিক শাসনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া এ শোভাযাত্রা ২০১৬ সালে ইউনেসকোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। এবারের আয়োজনেও সেই ইতিহাস ও চেতনারই প্রকাশ থাকবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।