বাংলাদেশ বিনিয়োগের সেরা দেশ : প্রধান উপদেষ্টা

বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ উন্মুক্ত, কোনো বাধা ছাড়াই ব্যবসা করা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে এ অঞ্চল জুড়ে ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি হবে বলে বিনিয়োগকারীদের আশা দেখিয়েছেন তিনি।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ব্যবসার সঙ্গে সঙ্গে দেশকে পরিবর্তনের আগ্রহ কারও থাকলে তার জন্য বাংলাদেশ হতে পারে সেই জায়গা। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে দুনিয়াকে পরিবর্তনের পাগলাটে ধারণাগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে। তার ভাষায়, ‘এটি একটি শক্তিশালী অঞ্চল, অনেক সম্পদ রয়েছে; আমরা একসঙ্গে এটিকে সহজতর করতে পারি।’

গতকাল বুধবার বিডা ইনভেস্টমেন্ট সামিটের তৃতীয় দিনে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলন’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে এ কথা বলেন সরকারপ্রধান। উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের তিনি শোনান নোবেলজয়ী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংক ও দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।

বিনিয়োগ সম্মেলনে আসা ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে ইউনূস বলেন, ‘আমরা আপনাদের আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য স্বাগত জানাই। একটি নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করার মিশনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাই। বাংলাদেশে ব্যবসা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, এটি পুরো বিশ্বের জন্যই হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য সেরা জায়গা। বাংলাদেশে ব্যবসা নিয়ে আসুন এবং এর মাধ্যমে বিশ্বকে বদলে দিতে ভূমিকা রাখুন। বাংলাদেশ এমন এক দেশ, যার বিশ্বকে বদলে দেওয়ার অভিনব সব ধারণা রয়েছে। এসব ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। আমরা আপনাদের আমন্ত্রণ জানাই, শুধু বাংলাদেশকে নয়, পুরো বিশ্বকেই বদলে দেওয়ার যাত্রায় যুক্ত হন।’

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আপনি যদি কোনো লক্ষ্য নিয়ে ব্যবসা করতে চান, তাহলে বাংলাদেশই আপনার সেই জায়গা। বাংলাদেশ কাজ করে দেখায়, আর একবার কেউ শুরু করলে অন্যরাও তার অনুসরণ করে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো অঞ্চলেই বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।’

সরকারপ্রধান বলেন, টাকা উপার্জন করা সুখ, কিন্তু অন্যদের সুখী করা হলো সুপার সুখ। যদি আপনি বাংলাদেশে ব্যবসা করেন, তাহলে আপনি দুটি সুখই পাবেন এবং এগুলো আপনি অতিরিক্ত খরচ ছাড়াই পেয়ে যাবেন।

তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এই অতিরিক্ত সুখ বা আনন্দ উপভোগ করতে পারবে, যদি তারা তাদের প্রভাব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশ ‘ক্রেজি আইডিয়া’র দেশ।’’ 

বাংলাদেশ বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত স্থান উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ খুবই অল্প সময়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।’ 

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ : অধ্যাপক ইউনূসের বক্তৃতায় আসে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা। তিনি বলেন, ‘৭৪ সাল সেই বছর, যাকে আমরা ভুলতে পারব না। মানুষ ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ করেছে। দেশ জুড়ে দুর্ভিক্ষ হয়েছে। পনের লাখ মানুষ মারা গেছে। ওটাই ছিল সেই দেশ যেখান থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘‘আমাদের জনগণ কৃষক হিসেবেই পরিচিত ছিল, তাদের আর কোনো পেশা ছিল না। তাদের মধ্যেই ছিল ভূমিহীন কৃষক। তাদের নিজের জমি ছিল না। আপনি যদি ‘চরম দারিদ্র্য’ শব্দটি শুনে থাকেন সেটাই ছিল বাংলাদেশ। এখানে জীবন ছিল খুব কঠিন।’’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘১৯৭৪ থেকে ২০২৫ একটা অসাধারণ ভ্রমণ। এখন আমরা বড় শিল্প নিয়ে কথা বলি। অনেক দেশকে আমন্ত্রণ জানাই আরও শিল্প স্থাপনের জন্য। আমরা একটি বিশাল বাজার নিয়ে কথা বলি। বাংলাদেশ খুব অল্প সময়ে অনেক দূর এগিয়েছে। তার কারণ মেধাবী তরুণ জনগোষ্ঠী।’

গ্রামীণ ব্যাংক ও গ্রামীণফোন প্রতিষ্ঠা : গ্রামীণ ব্যাংক শুরুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সেই দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশে একটি ছোট উদ্যোগ এসেছে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে। মানুষকে ২ বা ৩ ডলারের মতো ছোট ঋণ দেওয়া হতো, যেন তারা ছোট ব্যবসা শুরু করতে পারে। বিশেষভাবে নারীদের ওপর গুরুত্ব দিয়ে। এই ধারণা মাইক্রো ক্রেডিট নামে পরিচিত হয়। আমরা একটি ব্যাংক তৈরি করি, যার নাম গ্রামীণ ব্যাংক।’

তিনি বলেন, ‘এটা (ক্ষুদ্রঋণ) হয়ে উঠল একটি বৈশ্বিক নাম। আপনি যে দেশেই থাকুন না কেন, আপনার ভেতরে একটু হলেও ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ লুকিয়ে আছে। আপনি তাকে হয়তো চিনতে পারেন না, কিংবা লুকিয়ে রাখেন। আপনি জনগণের টাকা তাদের (দরিদ্রদের) দিয়ে দেন, ভাবেন এটাই সমাধান। কিন্তু গরিব মানুষকে শুধু সরকারি টাকা দেওয়াটা কোনো সমাধান নয়। আসল সমাধান হলো একটি কাঠামো তৈরি করা, মানুষের শক্তিকে মুক্ত করে দেওয়া। মাইক্রো ক্রেডিট ছিল সেই উদ্যোগের একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ।

গ্রামীণফোনের লাইসেন্স নেওয়ার সময়ের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘এক পাগলাটে চিন্তা এলো, সরকার ফোন ব্যবহারের লাইসেন্স দেবে। তখন আমাদের কোনো ফোনই ছিল না, টেলিফোন বলতে দেশে কিছুই ছিল না। শহরে হাতেগোনা কয়েকটা টেলিফোন ছিল, তার বেশিরভাগই কাজ করত না। তখন ভাবলাম, কেন আমরা একটা টেলিফোন কোম্পানির লাইসেন্সের জন্য আবেদন করি না? একেবারে পাগলাটে একটা ভাবনা ছিল। সরকার জিজ্ঞাসা করল, এই টেলিফোন লাইসেন্স দিয়ে কী করবে? কী ব্যবসা করবে? বললাম আমি এটা গরিব মহিলাদের হাতে তুলে দেব। ওরা আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করল। শেষমেশ লাইসেন্স পেয়ে যাই। নাম দিই ‘গ্রামীণফোন’। কেউ আমাদের সঙ্গে অংশীদার হতে চাইল না, কারণ আমাদের কোনো জ্ঞান ছিল না, কিছুই জানতাম না। তখন বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের কোনো বাজারই ছিল না।’ 

অবশেষে নরওয়ের টেলিনর কোম্পানি গ্রামীণফোনের অংশীদার হতে রাজি হয়। এখন এটি দেশের সর্ববৃহৎ টেলিফোন কোম্পানি। ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে যাত্রা শুরু করে গ্রামীণফোন। এখন দেশের সর্ববৃহৎ ও সবচেয়ে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে গ্রামীণফোনের।

চার প্রতিষ্ঠান ও এক বিদেশিকে বিশেষ সম্মাননা : সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়ংওয়ান করপোরেশনের চেয়ারম্যান কিহাক সাংকে বাংলাদেশের সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া বিনিয়োগে বিশেষ অবদানের জন্য ‘এক্সিলেন্স ইন ইনভেস্টমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয় চার কোম্পানিকে। পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ওয়ালটন (দেশি বিনিয়োগকারী), বিকাশ (বিদেশি বিনিয়োগকারী), স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও ফেব্রিকস।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘যারা পুরস্কৃত হয়েছেন, তাদের শক্তিশালী পাগলাটে ধারণাই তাদের সফল করেছে। শুধু বাংলাদেশকেই পরিবর্তন নয়, আপনারা ব্যবসার মাধ্যমে পৃথিবীকে বদলে দিন।’

তিন শূন্যের ধারণা নিয়ে যে পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন ইউনূস দেখেন, তা কেবল সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা মনুষ্যজাতি, পৃথিবী বদলাতে পারি। ব্যবসা আমাদের হাতে একটি শক্তিশালী টুল তুলে দিয়েছে। শূন্য বেকারত্বের ধারণায় তরুণরা খুব আগ্রহী হবে... আপনারা সবাই উদ্যোক্তা, চাকরি খোঁজার মানুষ নন, তাই উদ্যোক্তার মতো ভাবুন... বাংলাদেশ হলো সেই জায়গা।’

দেশের পোশাক শিল্পের শুরুর দিকের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘৭০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা কিছু সাহসী তরুণ অন্যরকম কিছু করার সাহস দেখিয়েছিল। বিদেশি দেশগুলোর গার্মেন্ট শিল্প দেখে তারা বলেছিল, ‘কেন আমাদের না?’ সেটিই ছিল বাংলাদেশে গার্মেন্ট শিল্পের সূচনা।’’

ইউনূস বলেন, ‘এখন আমরা দ্বিতীয় প্রজন্মে প্রবেশ করছি। দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তারা আমাদের শক্তি। এখন দেশের তৃতীয় প্রজন্ম উঠে আসছে, আমরা কি প্রস্তুত? এগুলো আমাদের চ্যালেঞ্জ।’

নারীরা যে উদ্যোক্তা হিসেবে অন্য সবার মতোই সৃজনশীল, সে কথা তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম পৃথিবী পরিবর্তন করবে, তাদের কাছে রয়েছে প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন এবং সমস্যা সমাধানের উদ্ভাবনী ধারণা। ৫০ বছর আগে সমস্যাগুলো আমরা যেভাবে দেখতাম, এখন সেভাবে দেখার প্রয়োজন নেই। সরকার কিছু করে দেবে সেই অপেক্ষা করার বদলে, আমরাই তা করে নিতে পারি। এটা একটা পরিবর্তন।’

কার্বন নিঃসরণকে আত্মবিধ্বংসী ব্যবস্থা আখ্যা দিয়ে তিনি সম্পদ কেন্দ্রীকরণ না করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অর্থ উপার্জন আনন্দের হলেও, সম্পদের কেন্দ্রীকরণ মানবজাতির জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। এটি পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলবে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) আয়োজনে ৭ এপ্রিল শুরু হয়েছে এ বিনিয়োগ সম্মেলন। চার দিনের এ সম্মেলনে দেশে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের সুযোগ এবং সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়াদি তুলে ধরা হচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে।

স্পেন থেকে অস্কার গার্সিয়া, যুক্তরাজ্য থেকে রোজি উইন্টারটন এবং বাংলাদেশ থেকে নাসিম মঞ্জুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বাংলাদেশের ব্যবসা এবং বিনিয়োগ সম্ভাবনার ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী।

শীর্ষ সম্মেলনে বিশেষভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গৃহীত অর্থনৈতিক সংস্কার এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পাইপলাইন গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নির্বাহী এবং নীতিনির্ধারকরা এ সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মানজুরসহ উদ্যোক্তারা। 

অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নাজরুল এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান, এসডিজি বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।