বিয়ের নামে ‘মোহরানা বাণিজ্য’ ও প্রতারণার অভিযোগ 

বিয়ের নামে মুন্সীগঞ্জের এক নারীর প্রতারণা ও মোহরানা বাণিজ্যের শিকার হয়েছেন ঢাকায় বসবাসরত চট্টগ্রামের এক বাসিন্দা। ভুক্তভোগী ওই ব্যবসায়ীর নাম মো. মহিউদ্দিন। তার গ্রামের বাড়ি রাউজান উপজেলার কেউটিয়ায়। বাবার নাম মোজাম্মেল হক। রাজধানী ঢাকার বসুন্ধরা সিটিতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে তার। অভিযোগ, ২০২০ সালের শুরুর দিকে ফেসবুকে সানজিদা আখতার নামে এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় মহিউদ্দিনের। বন্ধুত্বের এক পর্যায়ে উভয়ের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। সম্পর্কের একপর্যায়ে পরিবারের কেউ নেই বলে মহিউদ্দিনকে জানান সানজিদা। মহিউদ্দিনও তার (সানজিদা) প্রতি আরও আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।  

২০২০ সালে ১০ নভেম্বর এক লাখ টাকার দেনমোহরে সানজিদাকে বিয়ে করেন মহিউদ্দিন। কিন্তু এ খবর পরিবারের কাছ থেকে গোপন রাখেন মহিউদ্দিন। বিয়ের কিছুদিন না যেতেই খোলস পাল্টাতে থাকেন সানজিদার। সানজিদা মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানাধীন পূর্বকাঠাল বাড়ি গ্রামের মাতবর বাড়ির মৃত কাজল মাতবরের মেয়ে। পরিবারের কেউ নেই বলে জানালেও বিয়ের সাত মাসের মাথায় সানজিদার মা-ভাই, চাচা ও মামাসহ একাধিক আত্মীয় ‘আত্মপ্রকাশ’ করে। এবার ৮ লাখ টাকার দেনমোহরে সানজিদাকে বিয়ে করতে মহিউদ্দিনকে চাপ দেন সানজিদা ও তার পরিবার। সম্মান রক্ষায় তা মেনে নেন মহিউদ্দিন। ২০২০ সালের ১০ নভেম্বর বিয়ের অনুষ্ঠানে খরচ করেন ৩০ লাখ টাকা। ‘বিয়ের নামে এই নারীর প্রতারণায় আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমি সুবিচার চাই’ দেশ রূপান্তরকে বলেন মহিউদ্দিন।

মহিউদ্দিনের অভিযোগ, তাকে (মহিউদ্দিন) বিয়ে করার ৮ বছর আগে ২০১২ সালের ২৩ নভেম্বর মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার এলাকার জনৈক মোস্তফার ছেলে সালাউদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সানজিদার। দেনমোহর নির্ধারণ হয় সাত লাখ টাকা। কিন্তু প্রথম স্বামী সালাউদ্দিনের কথা মহিউদ্দিনের কাছে গোপন করেন সানজিদা। ২০২১ সালের ১০ মে সালাউদ্দিনের সঙ্গে সানজিদার ডিভোর্স হয়ে যায়। মোহরানার সাত লাখ টাকা বুঝে নেন সানজিদা। সালাউদ্দিনসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জ জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. জাকির হোসেনের আদালতে ২০২০ সালে পিটিশন মামলা (৩৪৪/২০২০) দায়ের করেন সানজিদা। সাত লাখ টাকা বুঝে নেওয়ার পর উক্ত আদালতে আপোষনামা দেন সানজিদা। 

মহিউদ্দিনের অভিযোগ, তাকে আইনী ঝামেলায় ফেলে যৌতুকের টাকা হাতিয়ে নিতে সিটি ব্যাংক ও ওয়ান ব্যাংকের মহিউদ্দিনের হিসাব নম্বরের সাতটি চেক ‘কৌশলে’ আত্মসাৎ করেন সানজিদা ও তার মা সালমা বেগম। চলতি বছরের ১৯ মার্চ যৌতুকের ১৫ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য শাশুড়ি সালমা বেগমের পক্ষে মহিউদ্দিনকে লিগ্যাল নোটিশ দেন ঢাকার আইনজীবী নীল কমল দাস। নোটিশে ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ব্যবসা পরিচালনার জন্য  শাশুড়ি সালমা বেগমের কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা মহিউদ্দিন ধার নেন বলে দাবি করেন। এছাড়া তার (সালমা বেগম) কাছ থেকে ধার হিসেবে মহিউদ্দিন আরও ১০ লাখ টাকা নেন বলে অভিযোগ করা হয়। উক্ত ১০ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য মহিউদ্দিন তাকে (সালমা) ওয়ান ব্যাংকের চেক প্রদান করেন বলে দাবি করা হয় নোটিশে।         

গত ১৯ মার্চ শাশুড়ি সালমা বেগমের দেওয়া লিগ্যাল নোটিশের জবাব দেন মহিউদ্দিন মহিউদ্দিনের আইনজীবী এ এম জুবায়ের। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর সিটি ব্যাংকে তার মক্কেলের একাউন্টের সাতটি এবং ওয়ান ব্যাংকের একটি চেক হারিয়ে যায়। এ ঘটনায় তার মক্কেল চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাজধানী শেরে বাংলা নগর থানায় সাধারণে ডায়েরিও (১৫০৬) করেন। পরে উক্ত চেকগুলোর বিষয়ে দুটি ব্যাংকেই পেমেন্ট বন্ধের লিখিত অনুরোধ করেন তার মক্কেল মহিউদ্দিন। তদুপরি সিটি ব্যাংকের একটি চেক(১৫ লাখ টাকার) রহস্যজনক কারণে ডিজঅনার করতে সক্ষম হন শাশুড়ি সালমা বেগম। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে তার মক্কেল অবহিত করেন। ব্যাংক থেকে ডিজঅনার করা একটিসহ মোট ৮টি চেক লিগ্যাল নোটিশ প্রদানকারী সালমা বেগম তার মক্কেলের অগোচরে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া মহিউদ্দিনের কাছে  মেয়ের যৌতুকের টাকা না পেয়ে শাশুড়ি সালমা বেগম জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ তার মক্কেলের। পাশাপাশি আত্মসাৎ করা চেকগুলো সাতদিনের ফেরত দিতে সালমাকে বলা হয়। কিন্তু সেসব চেক আজও ফেরত দেননি সালমা বেগম। 

প্রথম স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির আগেই আইনবর্হিভূত মহিউদ্দিনকে দ্বিতীয় স্বামী হিসেবে গ্রহণ করা এবং দুই দফা নিকাহনামা নিবন্ধন এবং যৌতুকের নামে ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করতে প্রতারণার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সানজিদা বৃহস্পতিবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার প্রথম বিয়ের খবর মহিউদ্দিন জানতেন। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। আপনি (প্রতিবেদক) আমার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেন।’ এরপর সানজিদার আইনজীবী নীল কমল দাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সানজিদার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয়ে কোনো প্রকার মন্তব্য করতে রাজি হননি। বক্তব্য জানতে সানজিদার মা সালমা বেগম, তার চাচাতো ভাই মুক্তার মাতবরের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তারা সাড়া দেননি।