উন্নত জীবন আর জীবিকার সন্ধানে ভীষণ বিপজ্জনক পথ জেনেও ১৪ বছর বয়সী জোবায়ের হোসেন জুয়েল ২০২৩ সালের জুনে নৌযানে সাগর পথে পাড়ি জমাচ্ছিলেন মালেয়শিয়ায়। দালালের খপ্পরে পড়ে সেদিন পরিবারকে না জানিয়েই রওনা দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু মিয়ানমারের জলসীমায় পৌঁছা মাত্রই অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে দেশটির পুলিশের হাতে আটক হন জুয়েলসহ আরও ২৫ জন। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ২২ মাস কারাভোগ করেন।
কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার পর জুয়েলসহ ২০ জনকে দেশটির কারাগার থেকে মুক্ত করে সমুদ্রপথে আজ মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) আনা হয় চট্টগ্রাম বন্দরে। তাদের সহযাত্রী বাকি ৬ জনকে ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মিয়ানমারের কারাগার থেকে মুক্ত করে আনা ২০ জনকে তাদের অভিভাবকের জিম্মায় দিতে আজ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। এসময় সন্তানদের ফিরে পেয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলেন অনেকেই।
কারাবন্দী থাকা অবস্থায় মিয়ানমার পুলিশের নানা নির্যাতন ও নিপীড়নের কথা তুলে ধরে জুয়েল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২২ মাস শুধু ডাল দিয়ে ভাত খেতে দিয়েছে তারা। তিন বেলা খাবার দিতেন না। সপ্তাহে একদিন গোসল করতে দিতেন। বেশিক্ষণ ঘুমাতে দিতেন না। পান থেকে চুন খসলেই চলতো শারীরিক নির্যাতন।’
‘টেকনাফে জ্বালানি তেলের এক ব্যবসায়ীর কর্মচারী ছিলাম। উন্নত জীবনের আশায় বিপদসংকুল জেনেও পরিবারকে না জানিয়ে সাগর পথে মালেয়শিয়া পাড়ি দিচ্ছিলাম। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। তবু্ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রচেষ্টায় মা-বাবার বুকে জীবিত ফিরতে পেরেছি, তাই আল্লাহর কাছে শোকরিয়া,’ বলেন জুয়েল।
ছেলেকে জীবিত ফিরে পেয়ে জুয়েলের মা রেনুয়ারা বেগম বলেন, ‘চারবোন তিন ভাইয়ের মধ্যে জুয়েল সবার ছোট। আশা করেনি আমার ছেলেকে জীবিত ফেরত পাব। বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।’
জুয়েলের সহযাত্রী ছিলেন ১৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ ফাহিম। তিনি পেশায় ছিলেন ড্রাম ট্রাক চালক। উন্নত জীবনের আশায় তিনিও জুয়েলের সাথে সাগরপথে মালেয়শিয়া যাচ্ছিলেন। আজ চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সন্তানকে ফিরে পেয়ে আনন্দের সীমা নেই মা লায়লা বেগমের।
তিনি (লায়লা) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আদম বেপারির খপ্পরে পড়ে ছেলেটা মালেশিয়া যেতে চেয়েছিল। আমাদের কিছু না বলে বাড়ি থেকে চলে গিয়েছিল সে। অনেকদিন খুঁজে না পেয়ে যোগাযোগ করে দেখি আমাদের হোয়াইকং ও আশেপাশের উখিয়া, টেকনাফ, কক্সবাজারের অনেক ছেলে দালালে লোভে পরে চলে গেছে।’
জানা গেছে, আজ মঙ্গলবার সকালে নৌবাহিনীর জাহাজে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছান ২০জন। তাদের মধ্যে কারও বয়স ১৫, কারও ১৭। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সামনে বাস থেকে একে একে নামেন তারা। ছেলে বা ভাইকে ২২ মাস পর কাছে পেয়ে দৌড়ে যান স্বজনেরা। এ সময় কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানান, মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটকের পর তাদের বাংলাদেশি নাগরিকত্ব যাচাই করে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা শুরু করে সরকার। এরপর বাংলাদেশ দূতাবাস তাদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করে।
ফিরে আসা এসব কিশোর–তরুণেরা কক্সবাজার জেলার টেকনাফ ও উখিয়া অঞ্চলের বাসিন্দা। রহমান নামে একজন বলেন, ‘পরিবারকে না জানিয়েই আমার শ্যালক মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিল। সে মিয়ানমারে আটক হয়। প্রায় এক মাস পর আমরা জানতে পারি। এখন সে পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে।’
কিশোর–তরুণদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘তথ্য যাচাই করে তাদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। আমরা তাদের পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করেছি।’
গত রোববার মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন শহরের এমআইটিটি বন্দর থেকে ২০ বাংলাদেশি নাগরিক বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজ বিএনএস সমুদ্র অভিযানে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা করে। মোহাম্মদ রফিক, চট্টগ্রাম