স্থানীয়ভাবে রিসাইকেল ফাইবার (পুনর্ব্যবহারযোগ্য সুতা) উৎপাদনে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট অব্যাহতি চেয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। পাশাপাশি সংগঠনটি রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য করপোরেট করহার ১২ শতাংশ, লিড কারখানার জন্য ১০ শতাংশ হারে রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। আর বাজেট প্রস্তাবে এনবিআরকে বিনিয়োগবান্ধব করনীতি প্রণয়ন করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের রাজস্ব বোর্ড ভবনে অনুষ্ঠিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিকেএমইএর অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার জন্য প্রয়োজন পণ্য ও সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি এবং বিভিন্ন অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম পুনঃস্থাপনের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর কর রেয়াত করা ইত্যাদি।
বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ছাড়াও বিটিএমএ, এসএমই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় অংশ নেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান ও এনবিআরের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
বিজিএমইএর সহায়ক কমিটির সদস্য এনামুল হক বলেন, ‘গ্যাসের দাম বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কীভাবে সামলাব জানি না। আবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিপদে আছেন। আমাদের হাতে মাত্র তিন মাস সময় আছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নিয়ে সমাধানে যেতে হবে। তৈরি পোশাকশিল্পে করপোরেট করহার পরিবর্তন করা হলে স্থানীয় ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থার ঘাটতি দেখা দেবে।’
বিকেএমই সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সোলার সিস্টেমের ওপর কর মওকুফ করা প্রয়োজন। সরকার আমাদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। আমরা সেখানে সরকারের সহযোগী ভূমিকা চাচ্ছি। আমরা সোলার প্যানেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চাই। এটার ওপর সরকার কোনো কিছু না রেখে, সম্পূর্ণ ফ্রি করা উচিত। তাহলে ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হবেন। খরচ কমে আসবে, আমরা শিল্পের লোকজন এটাতে যেতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস করনীতির পরিবর্তন হবে। বর্তমান করনীতি নিয়ে আমি অনেক কথা বলেছি যে কোনোভাবেই এটা বিনিয়োগ বা ব্যবসার জন্য সহায়ক নয়।’
বিটিএমএর পক্ষ থেকে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়, তার মধ্যে রয়েছে ফেব্রিকের স্থানীয় উৎপাদন খরচ আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য বিবেচনায় নিয়ে ফেব্রিকের ট্যারিফ ভ্যালু বাংলাদেশে ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ ও পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের আলোকে ফেব্রিকের ন্যূনতম ট্যারিফ ভ্যালু নির্ধারণ, আগের মতো বিটিএমএ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে বন্ড ছাড়া পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করা, পুনঃচক্র আঁশ বা রিসাইকেল ফাইবার উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে তৈরি পোশাকশিল্পের বর্জ্য বা ঝুট স্থানীয়ভাবে সংগ্রহের জন্য উৎপাদন ও সরবরাহ পর্যায়ে এবং উৎপাদিত পণ্য স্থানীয়ভাবে সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বা কম্পোজিট মিলে সরবরাহের ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে মূসক অব্যাহতি ইত্যাদি।
এসএমই ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবে মধ্যে রয়েছে নতুন এসএমইদের জন্য ১০ বছর পর্যন্ত টার্নওভার বা গ্রস রিসিপ্টের ওপর ন্যূনতম করারোপ না করা, যেসব এসএমইর বার্ষিক টার্নওভার ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত, তাদের ভ্যাট রিটার্ন প্রতি মাসের পরিবর্তে ষাণ¥াসিক ভিত্তিতে জমা দেওয়ার বিধান করা, উৎপাদনকারীদের শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পে স্থানীয় মুদ্রায় সরাসরি উপকরণ সরবরাহের ক্ষেত্রে মূসক অব্যাহতি দেওয়া, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ শিল্পে ব্যাকওয়ার্ড লিংকড ইন্ডাস্ট্রিগুলোয় ১০ বছরের জন্য কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া ইত্যাদি।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির পক্ষে সংগঠনটির অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ বলেন, ট্রাম্প যে প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করা শুরু করেছেন, তার প্রভাব রাতারাতি শেষ হয়ে যাবে না। তার এসব সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিকে টালমাটাল করে দিতে পারে। এমনকি শিগগিরই বিশ্ব আরেকটি মন্দার মুখোমুখি হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৩০ সালের বিশ্বমন্দার পরপরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। ট্রাম্পের এসব কর্মকা-ের কারণে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো পরিস্থিতিরও উদ্ভব হতে পারে। তিনি ট্রাম্পের শুল্কের প্রভাব নিরূপণে একটি সমন্বিত পর্যালোচনা সম্পন্ন করার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে তিনি ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানের সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেন।
সবার প্রস্তাব শুনে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এবার ব্যবসাবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করব। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে কর সুবিধা নিচ্ছেন। তার ধারাবাহিকতা চান। কিন্তু আমরা অভিযোগ পাই যে করহারের চেয়ে ইফেক্টিভ করহারের যোজন যোজন ফারাক। এগুলো আমরা যতটা সম্ভব সহজ করব।’ সবাই করহার কমানোর প্রস্তাব দেয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবার কথা শুনতে গেলে কর-জিডিপি অনুপাত এখন যে ৭ দশমিক ১ শতাংশ আছে, সেটি ৫ শতাংশে নেমে যাবে।’