গঠনতন্ত্র সংস্কার করে পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ সময়ের দাবি

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন ঘিরে নানা আলোচনা, দাবি ও কর্মসূচির পরও এখনো পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ প্রকাশ করেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের পর পেরিয়ে গেছে পাঁচ বছর, কিন্তু নতুন করে আর কোনো নির্বাচন দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গতকাল মঙ্গলবার প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি আংশিক রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়, যা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন।

তাদের দাবি গঠনতন্ত্রের মৌলিক সংস্কার এবং নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ছাড়া এ প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হবে না। ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মধ্যে গাফিলতি রয়েছে। তারা দ্রুত গঠনতন্ত্র সংশোধন করে পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।

ঢাবি সূত্রে জানা যায়, ডাকসু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চারটি কমিটি গঠন করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে কমিটিগুলো বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে ১৩টি বৈঠক করেছে। গত বছর ডিসেম্বর মাসে গঠনতন্ত্রের চূড়ান্ত খসড়া ছাত্রসংগঠনগুলোর কাছে পাঠানো হয়। জানুয়ারি মাসে কোড অব কন্ডাক্ট রিভিউ কমিটি করা হয়। তবে কমিটিগুলোর সিদ্ধান্ত এখনো সিন্ডিকেটের অনুমোদন পায়নি।

প্রশাসন জানায়, নির্বাচন কমিশন, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে মে মাসের প্রথমার্ধে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভোটার তালিকাও চূড়ান্ত করা হবে। তবে নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময় বা তারিখ এখনো জানায়নি প্রশাসন।

২৯ বছর পর ২০১৯ সালে সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়। গত বছর ২১ সেপ্টেম্বর ও ২২ নভেম্বর প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের বৈঠকে দ্রুত ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানানো হয়। ২ জানুয়ারি মধ্যরাতে ডাকসুর রোডম্যাপ ঘোষণার দাবিতে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ২৫ ফেব্রুয়ারি এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর স্বাক্ষর সংবলিত স্মারকলিপি উপাচার্য বরাবর জমা দেওয়া হয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটামও দেয়।

এরপর ১৩ জানুয়ারি ঢাবি প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে রোডম্যাপ ঘোষণার আশ্বাস দিলেও তা পূর্ণাঙ্গ হয়নি। এ ছাড়া, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ বা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ডাকসু নির্বাচনের দাবি জানান। তবে প্রশাসন বারবার আশ্বাস দিলেও তা বিলম্বিত হয়েছে। গতকাল ডাকসু নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করলেও সেখানে নির্বাচনের তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে নির্বাচন কবে হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে।

এদিকে, গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত না হওয়া, নির্বাচন কমিশন গঠন ও ভোটার তালিকা নিয়ে ধীরগতির কারণে নির্বাচন নিয়ে ছাত্রসমাজের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ছাত্রসংগঠনগুলো বলছে, সংস্কার ছাড়া ডাকসু নয়, সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও কার্যকর কাঠামো ছাড়া ডাকসু অর্থহীন হয়ে পড়বে। আবার দ্রুত ডাকসু নির্বাচন না দিলে ক্যাম্পাসে স্থিতিশীলতা আসবে না বলেও দাবি তাদের।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন সরকার বলেন, ‘ঢাবি শিক্ষার্থীরা যদি ডাকসুর জন্য কঠিন আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে, তবে এর চড়া মূল্য দিতে হতে পারে সব শিক্ষার্থীকে। কমিশন গঠন করার টাইমফ্রেম এটা, নির্বাচনের নয়। শুরু থেকেই টালবাহানা খেয়াল করছি, উই আর অলরেডি লেট। কেউ চায় না তার ক্যাম্পাস আবার কোনো ছাত্রসংগঠনের একক আখড়া হোক।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবির সভাপতি এসএম ফরহাদ বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের টাইমলাইন ঘোষণা ইতিবাচক, তবে দীর্ঘসূত্রতা ও নানা আনুষ্ঠানিকতা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বিভিন্ন অংশীজনের প্রয়োজনীয় মিটিং সম্পন্ন হলেও এখনো পর্যন্ত ডাকসু গঠনতন্ত্রের চূড়ান্ত কপি প্রকাশ করা হয়নি। নির্বাচন কমিশন গঠন ও ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণে আন্তরিকতা থাকলে মে মাস পর্যন্ত সময় লাগার কথা নয়।’

তিনি বলেন, ‘দ্ব্যর্থবোধক নির্দেশনা ও অস্পষ্ট শব্দচয়নে গঠিত এ টাইমলাইন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নাটকীয়তার শামিল। ডাকসু নির্বাচন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠনতন্ত্রের সংস্কার শেষ করে অসমাপ্ত প্রতিটি কাজের জন্য সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে হবে।’

ঢাবি শাখা ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি মেঘমল্লার বসু বলেন, ‘নির্বাচনের তারিখ নিয়ে আমাদের প্রশ্ন নেই। তবে ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন না করে নির্বাচন করা হলে সেটি অর্থহীন হয়ে যাবে। তাছাড়া ডাকসুর সভাপতি অবশ্যই নির্বাচিত প্রতিনিধি হতে হবে এবং তার ক্ষমতা সীমিত করতে হবে। তাকে অবশ্যই ছাত্র হতে হবে।’

গঠনতন্ত্র সংশোধন না করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ছাত্র ইউনিয়নের পদক্ষেপ কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো পাতানো বা নামকাওয়াস্তে নির্বাচনের দিকে যাব না। তবে প্রাথমিকভাবে ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলব। আমরা শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করব যেন তারা এমন নির্বাচনে অংশ না নেয়।’

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, ‘প্রশাসন চাইলে এক মাসের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন সম্ভব। আমরা বহুবার স্মারকলিপি দিয়েছি, দেখা করেছি। কিন্তু প্রশাসন সময়ক্ষেপণ করেছে। এত কিছুর পর আজকে রোডম্যাপ দিলেও তা সুনির্দিষ্ট না।’ তিনি বলেন, ‘ডাকসু নিয়ে প্রশাসনকে আরও সিরিয়াস হতে হবে। তাই দ্রুত ডাকসুর গঠনতন্ত্রের মৌলিক সংস্কার করে প্রশাসনের সামর্থ্য অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব ডাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা উচিত।’

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ‘ছাত্রদল শুধু ডাকসু নয়, সব ছাত্র সংসদের নির্বাচন চায়। তবে সুষ্ঠু ও অর্থবহ নির্বাচনের জন্য গঠনতন্ত্র ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ছাত্রদল ইতিমধ্যে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচন ঘিরে সুস্পষ্ট সংস্কার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। দ্রুত ওই সংস্কার নিশ্চিত করে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানাই।

ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী। আমরা চাই, সবার মধ্যে নির্বাচন নিয়ে ঐক্য তৈরি হোক। সবার মধ্যে এ ব্যাপারে যেন সমঝোতা হয়। দীর্ঘদিন পর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এ পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সবাইকে নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন করতে চাই। এ ক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা কাম্য।’