২০ কোটি টাকা লুটের অভিযোগ বিসিবিতে দুদক

ঘরোয়া লিগে ফিক্সিং-দুর্নীতির ইস্যুতে গত কয়েকদিন ধরেই সরগরম দেশের ক্রিকেটাঙ্গন। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার হঠাৎ করেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) হানা দিয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। খবরটা আগে থেকে বিসিবি কর্মকর্তাদের জানা না থাকায় কিছুটা হলেও হতচকিত হয়ে পড়েন তারা। পরে বিসিবি কার্যালয়ে চলে দুদক প্রতিনিধিদলের অনুসন্ধান। প্রায় দেড় ঘণ্টার এই অনুসন্ধান শেষে দুদক কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তারা বিসিবির কাছে তথ্য চেয়েছেন।

অভিযোগ তিনটি হলো বিসিবির আয়োজনে মুজিব শতবর্ষ উদযাপনে খরচের গরমিল, বিপিএলের তৃতীয় থেকে দশম আসর পর্যন্ত টিকিট বিক্রির হিসাব ও তৃতীয় বিভাগ বাছাই ক্রিকেটের

এন্ট্রি ফির অনিয়ম। এছাড়া দুদকের প্রধান কার্যালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে বিভিন্ন ক্রিকেট লিগের বাছাই প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ অর্জনসহ নানাবিধ দুর্নীতি ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এনফোর্সমেন্ট অভিযানের নিমিত্তে টিম প্রেরণ।’

শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ বেশ জাঁকজমকভাবেই উদযাপন করেছিলেন বিসিবির তৎকালীন হর্তাকর্তারা। দুদকের অনুসন্ধানে জানা যায়, যেখানে ১৫ কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছিল, সেখানে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৫ কোটি টাকা। অথচ দুদকের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১৮ কোটির বেশি অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া মুজিব শতবর্ষের অনুষ্ঠানে টিকিট বিক্রি থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা আয় হয়েছে বলেও জেনেছে দুদক। কিন্তু সেই আয়ের হিসাব দেখানো হয়নি। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে শতবর্ষ উদযাপনে ২০ কোটি টাকার বেশি গরমিল ধরা পড়ে যেতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমিন বলেন, ‘মুজিব শতবর্ষের অনুষ্ঠান আয়োজনে প্রায় ২৫ কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছিল। তবে অভিযোগ আছে, এর মধ্যে মাত্র ৭ কোটি টাকার খরচ দেখানো হয়। বাকি ১৯ কোটি টাকার মতো খরচের হিসাব দেওয়া হয়নি। আজকের অভিযানে আমরা শুধু তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছি। বিসিবি আমাদের সহযোগিতা করছে। সবকিছু কমিশনের কাছে উপস্থাপন করা হবে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

বিপিএলের টিকিট বিক্রির আয়েও গরমিলের অভিযোগ পেয়েছে দুদক। ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি এই টি-টোয়েন্টি লিগের সর্বশেষ আসর শেষে বিসিবি সভাপতি ও টুর্নামেন্টের গভর্নিং কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, টিকিট বিক্রির আয় হয়েছে ১৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন, বিপিএলের প্রথম ১০ আসরে টিকিট থেকে মোট ১৫ কোটি টাকা পেয়েছিল বিসিবি। টিকিট বিক্রির আয়ে এই অস্বাভাবিকতা নিয়েও তদন্ত করছে দুদক।

এ বিষয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক আল আমিন বলেন, ‘আগে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ নিয়ে টিকিটের ব্যাপারে চুক্তি করা হতো। তারা টিকিট বিক্রি করে বিসিবিকে একটা অংশ দিত। গত ৩-৪ আসরে বিসিবি নিজ থেকে টিকিট বিক্রি করছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে একাদশ আসরে আমরা দেখেছি, ১৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে। আট বছরে যেখানে ১৫ কোটি, এক বছরেই ১৩ কোটি। রেকর্ডপত্র আমরা পেয়েছি। বিস্তারিত যাচাই করলেই বোঝা যাবে কী অসংগতি এখানে।’

প্রায় ১০ বছর পর এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগ। কিন্তু নাজমুল হাসান পাপনের আমলে এই লিগের এন্ট্রি ফি বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছিল। যে কারণে উচ্চ এন্ট্রি ফি দিয়ে দুই-তিনটি দল নামেমাত্র এই লিগে অংশ নিতে পারত। মূলত ভোটের রাজনীতি ঠিক রাখতেই এটা করেছিলেন পাপন। ধ্বংস হয়েছিল নতুন ক্রিকেটার উঠে আসার পাইপলাইন। এবার এন্ট্রি ফি কমিয়ে ১ লাখ টাকা করায় ৬০টি দল অংশ নিতে পেরেছে। এ নিয়েও অভিযোগের তদন্ত করবে দুদক।

দলের অংশগ্রহণ কমার পেছনে বোর্ডের বা ব্যক্তিগত কোনো প্রভাব ছিল কি না সেটি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান আল আমিন, ‘তৃতীয় বিভাগ বাছাই লিগে এবার ৬০টি দল অংশ নিয়েছে। আগে ২-৩ বা সর্বোচ্চ ৪ দলের লিগ হতো। এখানে হয়তো কোনো কারণ আছে। আমরা কাগজপত্র সংগ্রহ করেছি, এক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা বোর্ডের কোনো প্রভাব ছিল কি না দেখার জন্য। এমনিতেই বোঝা যাচ্ছে, আগে হয়তো অংশগ্রহণের স্বাধীনতা ছিল না, কোনো চাপ ছিল, যে কারণে দলগুলো আসত না। আমরা বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে বুঝতে পারব এখানে কী অসংগতি ছিল।’

এদিন বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ দেশের বাইরে থাকলেও অভিযান চলাকালে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী সুজন বিসিবি কার্যালয়ে ছিলেন। দুদকের অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনায় বিসিবি সব সময়ই সহযোগিতা করে এসেছে। দুদকের পক্ষ থেকে যে নথিপত্র চাওয়া হয়েছে, আমরা তা সরবরাহ করছি।’