ভোজ্য তেল উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৪ টাকা এবং প্রতি লিটার পাম তেলের দাম ১২ টাকা বাড়ানোর ঘোষণার অনুমোদন দিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে সরকার আমদানি পর্যায়ে শুল্কছাড় দিয়ে দাম কমানোয় যে ভর্তুকি দিয়েছিল, সে সুবিধাও আর দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। গতকাল মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা এসব কথা জানান। গত রবিবার বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম বাড়ানোর কথা জানায়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে গতকালের বৈঠকে ব্যবসায়ীদের ঘোষিত দামকেই অনুমোদন দেওয়া হয়।
তবে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, এটা তারা করতে পারেন না। মন্ত্রণালয় থেকে গতকাল দাম চূড়ান্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা যদি আগে ঘোষণা দেন, সেটা বেআইনি।
নতুন দাম অনুযায়ী প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল কিনতে এখন ১৮৯ টাকা খরচ করতে হবে, যা আগে ছিল ১৭৫ টাকা। ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৮৫২ থেকে বেড়ে ৯২২ টাকা করা হয়েছে। প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম ১২ টাকা বাড়িয়ে ১৬৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোজার মাসে দাম সহনীয় রাখতে সরকার ভোজ্য তেলের আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করেছিল। পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়েও ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হয়, যার মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ৩১ মার্চ। সর্বশেষ গত বছরের ডিসেম্বরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে ১৭৫ টাকা করা হয়েছিল।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, তেলের দাম বাড়ানোর ফলে ভোক্তাদের কিছুটা কষ্ট হবে। এটা সাময়িক উল্লেখ করে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, বাজারে আরও বেশিসংখ্যক ব্যবসায়ীকে যুক্ত করা হচ্ছে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দাম কমেও যেতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারদর ও ট্যারিফ কমিশনের নির্ধারিত প্রক্রিয়া মেনে হিসাব করলে এক লিটার বোতলজাত তেলের দাম পড়ত ১৯৭ টাকা, যেটা ১৮৯ টাকা করা হয়েছে।
জানা যায়, ঈদের আগে ২৭ মার্চ নতুন করে ভোজ্য তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেন মিলমালিকরা। তখন বোতলজাত সয়াবিনের দাম লিটারে ১৮ টাকা বাড়াতে চান ব্যবসায়ীরা। আর খোলা সয়াবিন তেলের দাম বাড়াতে চান লিটারে ১৩ টাকা। ভোজ্য তেলের কর-সুবিধার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরদিন ১ এপ্রিল থেকে এই দর কার্যকরের ঘোষণা দেন ব্যবসায়ীরা। কারণ হিসেবে তারা জানান, করছাড়ের সুবিধা তুলে নেওয়া ও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে তারা এই দাম বাড়াতে চান। ওইদিন দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা সংগঠনটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছিল। এর পর থেকেই সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠক হয় এবং দর-কষাকষি চলতে থাকে। যখন সরকারের পক্ষ থেকে অনুমোদন দিতে দেরি হচ্ছিল, তখনই বনস্পতি অ্যাসোসিয়েশন গত রবিবার তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।
বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘দাম বিশ্লেষণে আমরাও একটু বেশি সময় নিয়েছি। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর প্রেক্ষাপটে রমজানকেন্দ্রিক যে সুবিধাটা দেওয়া হয়েছিল, এই মুহূর্তে অব্যাহতি দেওয়াটা একটু সংবেদনশীল। শুধু রোজায় সরকার ৫৫০ কোটি টাকা এবং রমজান পর্যন্ত কয়েক মাসে ২ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দিয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিচালনার ব্যয়ের কথা বিবেচনা করে এভাবে রাজস্ব ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে।
ভোজ্য তেলে ভ্যাটছাড়ের মেয়াদ জুুন পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন।’
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, দেশে ৩০ লাখ টন ভোজ্য তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি সাপোর্ট আসছে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সরিষা ও রাইস ব্রান বা কুঁড়ার তেল থেকে। সরিষা থেকে সাত লাখ টন এবং ছয় লাখ টন রাইসব্রান বাজারে আনতে পেরেছি। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
তিনি আরও বলেন, বাজারের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দ্রুতই সেনাকল্যাণ সংস্থার তেলও বাজারে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির তিন লাখ লিটার সয়াবিন তেল বাজারজাতের সক্ষমতা থাকলেও তারা মাত্র ২০ হাজার মে টন তেল পরিশোধন করত। এ ছাড়া গ্লোব অয়েল, চট্টগ্রামের একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও আরও দু-তিনটি কোম্পানি বাজারে আসছে।
এদিকে ঢাকার বাজারের খুচরা দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোয় সয়াবিন তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই।
বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, শীত ও গরমকালে সয়াবিন ও পাম তেলের চাহিদা থাকে ভিন্ন ভিন্ন। দুটি তেলের মোট চাহিদার মধ্যে শীতে সয়াবিন থেকে আসে ৭০ এবং পাম অয়েল থেকে আসে ৩০ শতাংশ। আবার গরমে পাম অয়েল থেকে চাহিদা পূরণ হয় ৭০ এবং সয়াবিন থেকে আসে ৩০ শতাংশ।
বাজারে চালের দাম বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চালের দাম কিছুদিন ধরেই বাড়তি। আর সপ্তাহ দু-একের মধ্যেই বোরো ধান বাজারে আসবে, তখন দামটা সহনীয় পর্যায়ে আসবে। কারণ চিকন চাল হিসেবে পরিচিত মিনিকেট বা নাজির যেটা, তা মূলত বোরো ধান থেকে আসে। এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ধানের ফলনও ভালো হবে বলেই আশা করা হচ্ছে।’
তেলের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক : সয়াবিন তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৪ টাকা এবং নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত সরকারের অপরিণামদর্শিতা জানিয়ে অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি এ আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গ্রাহক পর্যায়ে সয়াবিন তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ১৪ টাকা এবং নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির যে সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেছে, তা অযৌক্তিক। নতুন শিল্পে প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নতুন শিল্পে প্রতি ইউনিট গ্যাসের মূল্য এখন ৩০ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। সরকারের এ সিদ্ধান্ত নতুন শিল্প উদ্যোক্তাদের আশাহত করেছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অর্থনীতিতে সুবাতাস বইছে। দেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যেও আশার সঞ্চার হয়েছে। বিগত সরকারের শাসনামলে শিল্পবান্ধব পরিবেশ না থাকায় নতুন শিল্প গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে অনেকেই নতুন শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এমতাবস্থায় নতুন শিল্পে গ্যাসের দাম ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সরকারের অপরিণামদর্শিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে নতুন উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হবে। তাই নতুন শিল্প বিকাশের স্বার্থে সরকারের এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা উচিত।’