আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশায় দেশ। দিন যতই গড়াচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে অস্পষ্টতা ততই বাড়ছে। ফলে নির্বাচন নিয়ে সরকারের মনোভাব কী, তা স্পষ্টভাবে বুঝতে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আজ সাক্ষাৎ করবে। এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠান সামনে রেখে বিএনপি আগামী তিন মাস নানামুখী কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার পরিকল্পনা নিয়েছে বলেও জানা গেছে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের এজেন্ডা ঠিক করতে গতকাল মঙ্গলবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকও হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইং থেকে জানানো হয়েছে, আজ বুধবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দুপুর ১২টার দিকে এ বৈঠক হবে। বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা বৈঠকে থাকবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এবার দলের পক্ষ থেকে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়বস্তুটি খানিকটা ভিন্ন। আমরা মূলত নির্বাচন নিয়ে সরাসরি কথা বলতেই যাচ্ছি। কারণ, গতবার আমরা যখন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছিলাম, তখন তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন হবে। আমরা তার কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলাম কারণ প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ১৮ মাস সময় যথেষ্ট।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তখন প্রধান উপদেষ্টাকে বলে এসেছিলাম, নির্বাচনসংক্রান্ত আপনার দেওয়া এ রোডম্যাপের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করবেন এবং বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে জাতির সামনে তুলে ধরবেন। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ আমরা দেখতে পাইনি। বরং বিভিন্ন সময়ে সরকারের উপদেষ্টাদের বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয় যে, জনগণ নাকি তাদের পাঁচ বছরের জন্য চায়। আবার প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব বলেছেন, ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে। ফলে নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা থেকে যাচ্ছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ নিয়ে সরকারের মনোভাব আমরা সুনির্দিষ্টভাবে জানা ও বোঝার চেষ্টা করব। সে অনুযায়ী তাকে (প্রধান উপদেষ্টা) নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার জন্য আমরা আহ্বান জানাব।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছর ডিসেম্বর থেকে আগামী জুনের মধ্যে ভোট অনুষ্ঠানের যে দীর্ঘ সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, তাতে এক ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে। তাই নির্বাচন ঠিক কবে কিংবা নির্বাচন নিয়ে সরকারের প্রকৃত অবস্থান কী, ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে বিএনপি নেতারা সেটি তুলবেন।
বিএনপি আশা করছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হোক। দলটি এও বলছে, নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুত রয়েছে। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলও একটি অবাধ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো শেষ করে দ্রুত নির্বাচন চায়। এমন বাস্তবতায় এখন সরকার সিদ্ধান্ত নিলেই দেশ নির্বাচনমুখী হতে পারে। বিএনপি মনে করে, দ্রুত নির্বাচন হলে দেশে বিদ্যমান নানা সংকট ধীরে ধীরে কেটে যাবে এবং দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
প্রধান উপদেষ্টা ছোট সংস্কার বা বড় সংস্কার বলতে কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটাও বিএনপি বুঝতে চাইছে। সংস্কার প্রক্রিয়া চলছে। বিএনপিও সংস্কারের কথা বলছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠকও হচ্ছে। সংস্কার প্রক্রিয়া চালু থাকা অবস্থায় নির্বাচনের রোডম্যাপ দেওয়া যাবে না, বিষয়টা তো এমন হতে পারে না বলেও মনে করে বিএনপি। এ ছাড়া সরকারের ভেতর এখনো স্বৈরাচারের দোসরা শক্তভাবে বসে আছে। কারা দেশবিরোধী নানা ষড়যন্ত্রে ব্যস্ত, সুযোগ পেলেই দেশের ভেতরে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেÑ তা জানাবে দলটি। ইতিমধ্যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বঞ্চিত’ ১১৯ কর্মকর্তাকে সচিব পদে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দিয়েছে সরকার। এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। বিষয়গুলোতে জাতির কাছে ভুল বার্তা যায়। এসব বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে বিএনপি। বারবার স্বৈরাচার দোসরদের অপসারণের ব্যাপারে দাবি জানালেও এ বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। বৈঠকে এটা তুলে ধরা হবে। এখনো বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অসংখ্য মামলা ঝুলছে। বিষয়টির কোনো সুরাহা হয়নি।
জানা গেছে, সরকারের সঙ্গে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ইস্যুতে আলোচনার পাশাপাশি বিএনপি এ দাবিতেও সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা করছে। দলটির স্থায়ী কমিটিতেও এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিএনপির অভিমত, যেহেতু এ অন্তর্বর্তী সরকার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এসেছে, সরকারকে সর্বতোভাবে সহযোগিতাও করছে। তাই সরকার ব্যর্থ হোক, এটা তারা চায় না। সে কারণে সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেবে না দলটি। তবে নির্বাচন যাতে দ্রুত হয় এবং নির্বাচন নিয়ে যাতে কোনো ষড়যন্ত্র না হয়, সেজন্য তারা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার চিন্তা করছে।
বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিতে আগামী তিন মাস নানামুখী কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকার পরিকল্পনা করছে দলটি। এসব কর্মসূচি হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কর্মসূচির মধ্যে থাকতে পারে সভা-সমাবেশ, পদযাত্রা, মিছিল। একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে এসব কর্মসূচি শুরু হয়ে ধাপে ধাপে তা পালিত হবে। ব্যাপক জনসমাগমের মধ্য দিয়ে প্রতিটি কর্মসূচি পালন করবে দলটি। সম্প্রতি বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকদের বৈঠকে প্রাথমিকভাবে এমন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা দলের হাইকমান্ডকে ইতিমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে অবহিতও করা হয়েছে। আজ বুধবারের বৈঠকে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট বার্তা না পেলে চলতি মাসের শেষদিক থেকে এসব কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে পারে বিএনপি।
দলটির নেতারা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিএনপির একাধিক অর্জন হবে। বিএনপি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন চায়। এমন প্রেক্ষাপটে এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে একদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য সাংগঠনিক গতিশীলতা তৈরি হবে, অর্থাৎ সংগঠনের সঙ্গে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংযুক্ত করা যাবে। এ ছাড়া রাজনীতির মাঠ এবং জনগণ যে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত, সেই চিত্রও তুলে ধরা যাবে। তাই প্রতিটি কর্মসূচিতে ব্যাপক জনসমাগমের মধ্য দিয়ে বিএনপি এ বার্তাও দিতে চাইবে যে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের ভোটবঞ্চিত জনগণ এখন গণতন্ত্রে উত্তরণের অপেক্ষায় আছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও ভোটের জন্য প্রস্তুত, তারা মাঠে সক্রিয় রয়েছে। ফলে নির্বাচন নিয়ে কোনো দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে পারবে না। অন্যদিকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকারের ওপরও এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে চায়, যাতে পরিস্থিতির আলোকে সরকারও নির্বাচন ইস্যুতে দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়।
সূত্রগুলো বলছে, সপ্তাহখানেক আগে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে আগামী তিন মাসব্যাপী একটি কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেটা অনানুষ্ঠানিকভাবে ইতিমধ্যে দলের হাইকমান্ডকে অবহিত করেছে।
ওই বৈঠকে থাকা একজন সাংগঠনিক সম্পাদক দেশ রূপান্তরকে বলেন, দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে মাঠে সরব উপস্থিতি ও দলীয় অবস্থান শক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এর অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে আগামী তিন মাসের টার্গেট নিয়ে দেশব্যাপী সভা-সমাবেশ, পদযাত্রা ও মিছিলের মতো শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বিবেচনায় নিয়েছি। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে এসব কর্মসূচি শুরু হতে পারে। সেটা সম্ভব না হলে উপজেলা থেকে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে জেলা, মহানগর ও বিভাগীয় পর্যায়ে কর্মসূচি পালিত হবে। এরপর ঢাকায় বড় সমাবেশ আয়োজন করা হতে পারে। চলতি মাসের শেষের দিকে এসব কর্মসূচি শুরু হতে পারে। তবে পরিস্থিতি বুঝে এ সময়ের মধ্যেও ঢাকায় বড় সমাবেশ হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে বিএনপি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট বার্তা না পেলে আমরা আবারও বসে কর্মসূচির খসড়া চূড়ান্ত করে হাইকমান্ডের কাছে জমা দেব। পরে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে কর্মসূচি চূড়ান্ত হবে।