যুদ্ধবিরতির নতুন প্রস্তাব নিয়ে দোলাচল

মধ্যস্থতাকারী দেশ মিসর ও কাতার গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে ইসরায়েলের নতুন একটি প্রস্তাব ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসকে দিয়েছে বলে জানিয়েছে মিসরের রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট সম্প্রচারমাধ্যম আল কাহেরা নিউজ টিভি। গত সোমবার তাদের দেওয়া এ খবরের দিনই হামাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন প্রস্তাবে অন্তত দুটি উপাদান আছে, যা নিয়ে হামাস কোনো ধরনের আলোচনাই করবে না। মধ্যস্থতাকারীরা এখন ইসরায়েলি প্রস্তাবটি হামাসের উত্তরের অপেক্ষায় আছে, সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে আল কাহেরা।

পরে সোমবারই হামাস এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ইসরায়েলের প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে এবং ‘যত দ্রুত সম্ভব’ এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে। যুদ্ধবিরতি নিয়ে যেকোনো চুক্তিতে গাজায় সংঘাত পুরোপুরি বন্ধ এবং ভূখণ্ড থেকে সব ইসরায়েলি সেনার প্রত্যাহারের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছে তারা।

এর আগে ফিলিস্তিনি এ সশস্ত্র গোষ্ঠীটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সামি আবু জুহরি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, হামাসের চাওয়া ছিল ইসরায়েলকে হামলা ও বৈরিতা পুরোপুরি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, কিন্তু প্রস্তাবে তা আসেনি।

নতুন প্রস্তাবে প্রথমবারের মতো তেল আবিব মধ্যস্থতার পরবর্তী পর্যায়ে হামাসের নিরস্ত্রীকরণও চেয়েছে, যাতে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীটি কখনোই রাজি হবে না, বলেছেন আবু জুহরি। তিনি বলেন, প্রতিরোধ বাহিনীর অস্ত্র হস্তান্তর এমন একটি সীমারেখা, যা নিয়ে আলোচনা তো বাদ, বিবেচনায়ও আনা যাবে না।

ইসরায়েল তাৎক্ষণিকভাবে নতুন প্রস্তাব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। মিসরের রাষ্ট্রীয় তথ্য পরিষেবার প্রধান আল কাহেরা টিভিকে বলেছেন, হামাস খুব ভালো করেই সময়ের মূল্য সম্পর্কে জানে এবং আমার বিশ্বাস তারা ইসরায়েলি প্রস্তাবের বিষয়ে দ্রুত তাদের মত জানাবে।

১৫ মাসের যুদ্ধ শেষে চলতি বছর জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মার্চেই তা ভেঙে পড়ে; এরপর ইসরায়েল নতুন করে গাজা ভূখণ্ডে অভিযানে নামে। ওই যুদ্ধবিরতি পুনর্বহাল এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি নিয়ে সোমবার কায়রোতে সর্বশেষ রাউন্ডের আলোচনাতেও কোনো ফল আসেনি বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিন ও মিসরের সূত্রগুলো।

হামাস চাইছে, ইসরায়েল যুদ্ধ বন্ধে প্রতিশ্রুতি দিক এবং জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া তিন ধাপের যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে তেল আবিব গাজা ভূখণ্ড থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করে নিক।

অন্যদিকে ইসরায়েল বলছে, হামাসকে নির্মূল ও গাজায় আটকে থাকা বাকি জিম্মিদের ফিরিয়ে না আনা পর্যন্ত তারা যুদ্ধ বন্ধ করবে না। আবু জুহরি বলেন, যুদ্ধ বন্ধ ও গাজা থেকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের বদলে একসঙ্গে সব জিম্মিকে হস্তান্তরে প্রস্তুত হামাস।

গত মাসে ফের অভিযান শুরু করা ইসরায়েল এ কদিনেই দেড় হাজারের বেশি মানুষ মেরেছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষ। তেল আবিবের একের পর এক হামলা এরই মধ্যে লাখ লাখ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করেছে, তারা এমনকি ভূখণ্ডটিতে মানবিক ত্রাণ সহায়তাও ঢুকতে দিচ্ছে না। ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে ৫৯ ইসরায়েলি এখনো জিম্মি; তাদের মধ্যে ২৪ জন জীবিত আছে বলে অনুমান ইসরায়েলের।

এদিকে গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদে, ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে দেশে ইসরায়েলি নাগরিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মালদ্বীপ। গতকাল মঙ্গলবার মালদ্বীপের গণমাধ্যম ও বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, মালদ্বীপের সংসদীয় কমিটি ইসরায়েলি পাসপোর্টধারীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে একটি বিল অনুমোদন দেওয়ার পরপরই গতকালই তাতে সই করেন প্রেসিডেন্ট মোহামেদ মুইজ্জু।

নিষেধাজ্ঞাটি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলা হয়, ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরায়েলের চলমান নৃশংসতা ও গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় সরকারের সুদৃঢ় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে এই বিল। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মালদ্বীপ ফিলিস্তিনিদের প্রতি তাদের অটল সংহতি বজায় রাখবে।

পর্যটনের জন্য বিখ্যাত দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে ২০২২ সালে প্রায় ১৬ হাজার ও ২০২৩ সালে প্রায় ১১ হাজার ইসরায়েলি পাসপোর্টধারী ভ্রমণ করতে এসেছে বলে জানিয়েছে মালদ্বীভস ইন্ডিপেন্ডেন্ট।

গত বছর জুন মাসে আইন করে ইসরায়েলিদের নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রাখে মালদ্বীপের পার্লামেন্ট। এরপর থেকে দেশটিতে ইসরায়েলিদের ভ্রমণ করার হার কমতে শুরু করে। গত বছর ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও দেশের জনগণকে মালদ্বীপ ভ্রমণ না করার আহ্বান জানায়।

পার্লামেন্টে এই বিলকেন্দ্রিক বিতর্কে ক্ষমতাসীন দল পিএনসির কিছু এমপি এ নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

পিএনসি সদস্য সৌধুল্লা হিলমি বলেন, ‘আমরা এভাবে কারও সঙ্গে শত্রুতা করতে পারি না। ইসরায়েলের আরব প্রতিবেশীরা যা করার সাহস পায়নি, তা করতে যাচ্ছি আমরা।’