মাদারীপুরে ধারাবাহিক সংঘর্ষে মামলা, আতংকে বন্ধ শতাধিক দোকান  

মাদারীপুর জেলার রাজৈরে দুই গ্রামের ধারাবাহিক ভাবে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত সোমবার (১৪ এপ্রিল) মধ্যরাতে জেলার রাজৈর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামালটি দায়ের করেন। এ মামলায় ৪৫ জনের নাম উল্লেখ ও আরো অজ্ঞাত ৩৫০ জনকে আসামি করা হয়। মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাজৈর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সঞ্চয় কুমার ঘোষ।

এদিকে এখনো সংঘর্ষ আতংকে বন্ধ রয়েছে শতাধিক দোকান। এর আগে এ সংঘর্ষের ঘটনায় দাঙ্গা হাঙ্গামা বন্ধ ও শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ফৌজদারী কার্যবিধি মতে রাজৈর বাজার, পশ্চিম রাজৈর, বদরপাশা ও গোপালগঞ্জ এলাকায় সোমবার দুপুর ১টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করেছিলেন রাজৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহফুজুল হক।

জানা যায়, ঈদের ৩য় দিন (২ এপ্রিল) বাজি ফাটানোকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক ভাবে ৪ দিন মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বেপারীপাড়া মোড়ে পশ্চিম রাজৈর ও বদরপাশা দুই গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে পুলিশের গাড়িতেও হামলার ঘটনা ঘটে। এসময় প্রায় ২৫টি দোকানে ভাংচুর ও লুটপাট তান্ডব চালানো হয়।

Madaripur 16-04-25 special news rajior pic (3)

এসব ঘটনায় মাদারীপুর জেলা অতিরিক্ত পুলিশ জাহাঙ্গীর আলম, রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মাসুদ খান, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সঞ্চয় কুমার ঘোষ, দুই এসআই তারেক ও মোস্তফা, পুলিশের গাড়ি ড্রাইভার শাহাবুদ্দিন ও আরো ১০ পুলিশ সদস্য সহ উভয় পক্ষের প্রায় শতাধিক আহত হয়।

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজৈর বাজার রোডের দুই পাশে পোড়া হল থেকে থানার মোড় পর্যন্ত ছোট বড় কয়েক হাজার দোকান রয়েছে। এর মধ্যবর্তী স্থান বেপারীপাড়া মোড়ের চারিদিকে রয়েছে কয়েক শতাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। দোকানগুলোর অধিকাংশই ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় রয়েছে। ওই মোড়েই বদরপাশা ও পশ্চিম রাজৈর দুই গ্রামের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এজন্য পুনরায় দুই গ্রামের সংঘর্ষ হওয়ার আতংকে নিজেদের
জীবন রক্ষার্থে দোকান বন্ধ রেখেছেন ব্যবসায়ীরা। শুধু মাত্র দুইটি ভাতের হোটেল, ৩টি চায়ের দোকান ও ১ টি সিঙ্গারা-পুরির দোকান খোলা দেখা যায়।
সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্থ ভাতের হোটেল ব্যবসায়ী বৃদ্ধ নিরঞ্জন বিশ্বাস জানান, তার দোকানে থাকা ৩ বস্তা চাল, হাড়ি-পাতিল, তেল লুট হয়ে গেছে। দোকানের টিন ভাংচুর করা হয়েছে। এছাড়াও এই বাজারের অনেক দোকানে ভাংচুর লুটপাট করা হয়েছে। তাই ভয়ে কেউ দোকান
খোলে নাই। কিন্তু তার দোকান খুলতে হইছে। কারণ এই ব্যবসার উপরেই ছেলে-মেয়ের পড়ালেখাসহ সব খরচ চালাতে হয়। মেয়ে এসএসসি পরিক্ষা দিচ্ছে আর ছেলে ৭ম শ্রেণীতে পড়ে।

রাজৈর বাজার বনিক সমিতির সদস্য ও ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী ইমাম শাহরিয়ার জানান, দফায় দফায় এ সংঘর্ষের ঘটনায় বাজারের দোকানগুলোতে ব্যপক ভাংচুর লুটপাট তান্ডব চালানো হয়েছে। এজন্য এখনো ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতংকিত বিরাজ করছে। যে কারণে দোকান খুলে নাই। তার টিভি ও ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিকস পণ্যের শোরুমে ভাংচুর ও লুটপাট করায় প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় বনিক সমিতির পক্ষ থেকে বিচার ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি পূরণ দাবি করছি।

রাজৈর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সঞ্চয় কুমার ঘোষ জানান, দুই গ্রামের সংঘর্ষের ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ মামলায় ৪৫ জনের নাম উল্লেখ ও ৩৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। তবে এ মামলা সংক্রান্ত কাউকে এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা যায়নি। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।

উল্লেখ্য, ঈদ পরবর্তী সময় গত ২ এপ্রিল রাজৈর উপজেলার পশ্চিম রাজৈর গ্রামের ফুচকা ব্রিজ এলাকায় বাজি ফাটায় বদরপাশা গ্রামের আতিয়ার আকনের ছেলে জুনায়েদ আকন ও তার বন্ধুরা। এসময় ওই গ্রামের মোয়াজ্জেম খানের ছেলে জোবায়ের খান ও তার বন্ধুরা মিলে তাদের বাধা দেয়। এনিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এরই জেরে গত ৩ এপ্রিল সকালে রাজৈর বেপারিপাড়া মোড়ে জোবায়েরকে একা পেয়ে পিটিয়ে তার ডান পা ভেঙে দেয় জুনায়েদ ও তার লোকজন। পরে আহত জোবায়েরের বড় ভাই অনিক খান (৩১) বাদি হয়ে জুনায়েতকে প্রধানসহ ৬ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ৪/৫ জনকে আসামি করে রাজৈর থানায় একটি মামলা দায়ের করে।

এ ঘটনায় ক্ষোভে ফুসে ওঠে উভয় গ্রামের লোকজন। একপর্যায়ে শনিবার (১২ এপ্রিল) রাতে দুই গ্রাম পশ্চিম রাজৈর ও বদরপাশার লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তিন ঘন্টাব্যাপী এ সংঘর্ষ চলে। এসময় ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে খবর পেয়ে রাজৈর থানার পুলিশ ও সেনাবাহিনী এসে ঘন্টাব্যাপী প্রচেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে দুই ওসি ও অন্তত ১০ পুলিশ কর্মকর্তা-সদস্যসহ ২৫ জন আহত হয়।

পরবর্তীতে রোববার (১৩ এপ্রিল) দুপুরে বদরপাশা ও পশ্চিম রাজৈর গ্রামের দুই পক্ষের লোকজনকে ডাকলে উভয়পক্ষ মিমাংসার জন্য রাজি হয়। সোমবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ১০ টার সময় শালিস মিমাংসার জন্য বসার কথা ছিল। এরই মধ্যে রোববার (১২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় উভয় পক্ষের লোকজনের উস্কানিমূলক কথাবার্তায় উত্তেজিত হয়ে আবারো দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসময় বেশ কয়েকটি ককটেল
বিস্ফোরণ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাংচুর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একপর্যায়ে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয় পুলিশ। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি শান্ত হয়। এরপর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে রাজৈর ও টেকেরহাট ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। ঘটনাস্থালে র‍্যাব মোতায়েন করা হয়।