ঢাবিতে আরও ৯টি হল হচ্ছে

পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ১৯২১ সালে যাত্রা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি)। বর্তমানে আবাসিক হল রয়েছে ১৯টি। এর মধ্যে ছাত্রদের ১৪টি, ছাত্রীদের পাঁচটি হল রয়েছে। এই ১৯টি হলে আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর। প্রতিবছর বাড়ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ফলে আবাসিক হলগুলোয় স্থান সংকুলান হচ্ছে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে ৯টি আবাসিক হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছাত্রদের জন্য ৫টি, ছাত্রীদের জন্য ৪টি। এতে আরও সাত হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা সৃষ্টি হবে।

পাশাপাশি শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, গ্রন্থাগার উন্নয়ন, খেলার মাঠের উন্নয়ন, ডাকসু ভবন নির্মাণ ও অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হবে। সব মিলে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) পরবর্তী সভায় প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এটি মূলত একটি আমব্রেলা প্রকল্প। যার অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮টি উন্নয়নকাজ করা হবে। এর মধ্যে ৯টি আবাসিক হল রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেহেতু জায়গা সংকট আছে, তাই পুরনো হলগুলোর খালি জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে আবাসন সংকট নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এদিকে নতুন হল নির্মাণের খবরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি তারা বেশ কিছু দাবিও জানিয়েছেন। জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শাহরিয়ার লিয়ন গতকাল বুধবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন হল করার উদ্যোগ আমাদের জন্য আনন্দের। তবে বর্তমানে হলগুলোর কক্ষগুলো যে আদলে করা হয়েছে, নতুন হলগুলো যেন সেভাবে করা না হয়। বর্তমানে অধিকাংশ কক্ষ চার জন শিক্ষার্থীর থাকার জন্য। কিন্তু সেখানে অনেক ক্ষেত্রে ৮-১০ জনকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। ফলে নতুন ভবনে যেন প্রতিটি কক্ষ দুই জনের উপযোগী করে গড়ো তোলা হয়।’

হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শিবলী রহমান পাভেল বলেন, ‘বর্তমানে হলটির পুরনো ভবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ঝড়োবাতাসেই খসে পড়ছে পলেস্তারা। কাজেই এ ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা উচিত। নতুন ভবন তৈরি করা হলে সেটি শিক্ষার্থীদের জন্য খুবই উপকারে আসবে।’

তিনি দাবি করে জানান, বর্তমানে হলটিতে গেমস রুম নেই। আর যে রিডিং রুম আছে, সেটিও খুব ছোট। তাই নতুন ভবনে যেন এসব সুবিধা পর্যাপ্তমাত্রায় সংযুক্ত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে রেগুলার স্নাতক (সম্মান) ও অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা মাস্টার্স শিক্ষার্থী মিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো। এর মধ্যে স্নাতকসহ যারা মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। বাকিরা  নৈশকালীন ও অন্যান্য কোর্সের শিক্ষার্থী। মূলত যারা স্নাতক বা আন্ডারগ্রেড কোর্সে ভর্তি হন, তারাই আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পান। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব হল রয়েছে, তাতে ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা আছে। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থাকতে হয়। আর অনেক শিক্ষার্থী দ্বৈতাবাসিক হিসেবে গাদাগাদি করে হলেই অবস্থান করেন। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরেই আবাসন সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছিল। এ বিষয়ে ২০১৮ সালে ২ হাজার ১২৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নানা কারণে সেই প্রকল্প আর আলোর মুখ দেখেনি। এর মধ্যে নির্মাণকাজের রেট শিডিউল পরিবর্তন হয়। ফলে প্রকল্প প্রস্তাব ফের নতুন করে সাজানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে। প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। কিন্তু বর্তমানে সরকার কৃচ্ছ্র সাধনের নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে কিছুটা ব্যয়সংকোচন করে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা।

নতুন ৯টি হল ও সম্প্রসারিত নতুন ভবন নির্মাণ করা হলে আরও সাত হাজার শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা সৃষ্টি হবে। ফলে আবাসন সুবিধা দাঁড়াবে ২৩ হাজারে। ধীরে ধীরে এটি ৩০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক উন্নয়নে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবেই এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে মূলত ছাত্ররা এখানে ভর্তি হতেন। তখন ছাত্রী সংখ্যা ছিল খুবই কম। ফলে আবাসনের জন্য তখন ছাত্রদের বিষয়টিই গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির হার বেশি। কয়েক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন, তাদের মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি ছাত্রী। যে কারণে এখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ছাত্রীদের আবাসন সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে জোর দিতে হচ্ছে বেশি। সেজন্য বর্তমান প্রকল্পের বাইরে ছাত্রীদের জন্য বিদেশি অর্থায়নে আরও হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর প্রস্তাবিত ৯টি হল ও সম্প্রসারিত ভবনের মধ্যে চারটি ছাত্রীদের জন্য এবং পাঁচটি ছাত্রদের জন্য। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ২ হাজার ৬০০ ছাত্রীর আবাসন সৃষ্টি হবে এবং ৫ হাজার ১০০ ছেলে শিক্ষার্থীর আবাসন সুবিধা নিশ্চিত হবে।

এ প্রকল্পের আওতায় যে শিক্ষার্থীদের জন্য যেসব ভবন নির্মাণ করা হবে, সেগুলো হচ্ছে হাউজ টিউটরের ভবনসহ শাহনেওয়াজ হোস্টেলের স্থলে ১৫-তলা ছাত্রী হল নির্মাণ, হাউজ টিউটরের ভবনসহ শামসুন নাহার হলের সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণ, হাউজ টিউটরের ভবনসহ লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের অভ্যন্তরে ছাত্রী হল নির্মাণ, হাউজ টিউটরের ভবনসহ বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণ, হাউজ টিউটরের ভবনসহ শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণ, হাউজ টিউটরের ভবনসহ মাস্টার দা সূর্যসেন হলের সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণ, হাউজ টিউটরের ভবনসহ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণ, হাউজ টিউটরের ভবনসহ হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণ এবং হাউজ টিউটরের ভবনসহ ড. কুদরত-ই-খোদা হলের সম্প্রসারণ ভবন নির্মাণ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন শীর্ষক এ প্রকল্পের উপপরিচালক জাবেদ আলম মৃধা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেছে পরিকল্পনা কমিশন। আগামী একনেক সভায় প্রকল্পটি উত্থাপিত হতে পারে বলে আমরা জানতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মাস্টারপ্ল্যান রয়েছে, সেটির বাস্তবায়ন কার্যক্রম অনেকখানি এগিয়ে যাবে।

প্রকল্পটির আওতায় আরও যেসব কাজ করা হবে, তার মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবনের সম্প্রসারণ, আইএসআরটি ও ফার্মেসি বিভাগের জন্য একটি ১০ তলা ভবন নির্মাণ, উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের জন্য তিনতলা ভবন নির্মাণ, চারুকলা অনুষদের জন্য অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ, বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের জন্য ১০ তলা টাওয়ার ভবন নির্মাণ, একটি সেমি বেজমেন্ট ফ্লোরসহ ১১ তলা ও পাঁচতলা প্রেস কাম অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ, প্রো-উপাচার্যের বাংলো নির্মাণ, শিক্ষকদের জন্য ১৫ তলা আবাসিক ভবন নির্মাণ, ছয়তলা চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ, চারতলা মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ, ১২ তলা মাল্টিপারপাস ডাকসু ভবন নির্মাণ, ২০ তলা ও চারতলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, জিমনেসিয়াম ভবনের অবশিষ্ট কাজ সমাপ্তকরণ, জলাধার সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধন, বিদ্যমান সার্ভিস লাইন মেরামত, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ উন্নয়ন, পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, ড্রেনেজ সিস্টেমের উন্নয়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।