'রেমোন্তাদা'র মোহভঙ্গ রিয়ালের, মৌসুমটাই ছিল ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি

অসংখ্যবার বলা হয়েছিল ‘রেমোন্তাদা’—ফিরে আসার গল্প, চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদের অতুলনীয় ঐতিহ্য। জুড বেলিংহ্যামও শুনেছেন, দেখেছেন, বিশ্বাসও করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা বড়ই কঠিন। 'ম্যাজিক বলে কিছু নেই,' কার্লো আনচেলত্তির সেই সতর্কবার্তাটাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো।

‘রেমোন্তাদা’—স্প্যানিশ এই শব্দটির মানে ‘ফিরে আসা’, বিশেষ করে যখন কোনো দল প্রথম লেগে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পরের লেগে ম্যাচ বা সিরিজ জিতে নেয়। রিয়াল মাদ্রিদ বহুবার এমন অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী থেকেছে, গড়ে তুলেছে কিংবদন্তি। কিন্তু এবার হয়নি, কারণ এবার তারা হার মানলো নিজেদেরই ব্যর্থতার কাছে।

দুই লেগ মিলিয়ে ১৮০ মিনিটের লড়াই শেষে স্পষ্ট হলো একটাই চিত্র—এই রিয়াল মাদ্রিদ আসলে নিজের ছায়াকেই ছুঁতে পারেনি। কোনো নাটকীয়তা নেই, নেই প্রত্যাবর্তনের গৌরবগাঁথা। দ্বিতীয় লেগেও আর্সেনালের বিপক্ষে খেলায় না থাকার মত অবস্থাই ছিল লস ব্লাঙ্কোসদের।

'ফুটবলের এটাই আরেকটা রূপ। আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আজকের মত দুঃখের দিনও আছে,' ম্যাচ শেষে বললেন আনচেলত্তি। 'সমালোচনা হবে, তা মেনে নিতে হবে। দুই লেগ মিলিয়ে আর্সেনাল আমাদের চেয়ে ভালো দল ছিল।'

প্রথম লেগে ৩-০ ব্যবধানে হারের পরই বেলিংহ্যাম বলেছিলেন, 'আমরা মাঠে ছিলাম না। ওরা আরও বেশি গোল করতে পারতো।' দ্বিতীয় লেগেও সেই ছবিই যেন প্রতিফলিত হয়েছে। একটি গোল করলেও সেটা উপহার বলেই ধরে নেওয়া যায়। গোলের মতো সুযোগ তৈরি করাই যেন হয়ে উঠেছিল দুষ্কর। পুরো ১৮০ মিনিটে মাত্র ৬টি শট ছিল লক্ষ্যে, যা রিয়ালের মতো দলের জন্য নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।

আনচেলত্তি চেয়েছিলেন—মাথা, হৃদয় আর সাহস একত্রিত হোক। কিন্তু মাঠে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। কোনো প্রতিরোধ, কোনো বুদ্ধিদীপ্ত পরিকল্পনা, কিছুই যেন ছিল না। অন্যদিকে, আর্সেনাল নিজেদের দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করেছে—একদম নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে।

সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে যখন আর্সেনাল সমর্থকদের কণ্ঠে ‘ওলে’ ধ্বনি উঠে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় কোন দল কাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। দ্বিতীয়ার্ধে রিয়ালের প্রথম লক্ষ্যে শট নিতে লাগে পুরো এক ঘণ্টা। শেষ পর্যন্ত ডেভিড রায়া মাত্র তিনবার পরীক্ষা দিতে বাধ্য হন, তাও সহজসব শটে।

রিয়াল গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া ছিলেন একমাত্র যিনি ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন, বলেন, 'আমরা একের পর এক ক্রস করছিলাম, কিন্তু এটা কাজে দিচ্ছিল না। কারণ, আমাদের দলে এমন কোনো স্ট্রাইকার নেই যে হাওয়ায় ভেসে থাকা বলে গোল করতে পারে।'

দানি কারভাহাল ও টনি ক্রুসের অনুপস্থিতি এই ম্যাচে স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়েছে। আবার এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের এক জায়গায় খেলতে চাওয়াটাও দলে ভারসাম্যহীনতা এনেছে। স্কোয়াড গঠনে যে ফাঁকফোকর ছিল, সেটি পূরণ করা হয়নি। আনচেলত্তিও তা মেনে নিয়েছেন, বলেছেন, 'এই মৌসুমে দলগত কমিটমেন্ট, আত্মত্যাগ ও পরিচয় ছিল অনুপস্থিত।'

চ্যাম্পিয়নস লিগে এটা তাদের টানা তৃতীয় পরাজয়। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এটি মৌসুমের ১২তম হার। এখনও লা লিগা শিরোপা ও কোপা দেল রে ফাইনাল বাকি থাকলেও প্রশ্ন উঠেছে—এই রিয়াল কি আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে?

আনচেলত্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন অনিশ্চয়তা। 'আমি জানি না। জানতে চাইও না,' বললেন তিনি। ক্লাব সিদ্ধান্ত নিলেই সরে দাঁড়াবেন, এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন ইতালিয়ান কোচ।

এক সাংবাদিক জানতে চেয়েছিলেন, 'আপনার রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এটি কি শেষ চ্যাম্পিয়নস লিগ ম্যাচ?' হেসে উত্তর দেন আনচেলত্তি, 'এই মৌসুমে তো বটেই—দুঃখজনকভাবে!'

রেমোন্তাদার গল্প এদিন থেমেছে। তবে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি, দায়িত্ববোধ আর আত্মসমালোচনার সময় এখন। রিয়াল মাদ্রিদ কি পারবে আবার নিজেকে খুঁজে পেতে? সময়ই বলবে।